
একটি শরীরের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেলে সেই দেহ মৃত হোক না মানব বা কোন প্রকার প্রাণীর; ধনমী শিরার অজস্র শাখা প্রশাখার মাধ্যমে সমস্ত মানব শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গে কলা-কোষে অক্সিজেন খাদ্যসহ জীবনী শক্তি প্রবাহিত হয়। আবার দেহের বর্জ্য বহন করে নির্গম অঙ্গে স্থানান্তর করে। আর তখনই দেহ সুস্থ সুন্দর প্রাণবন্ত থাকে। ঠিক তেমনই একটা দেশে নদী তার শাখা-প্রশাখা প্রবাহের মাধ্যমে দেশের জীবমণ্ডলের মাঝে প্রাণ সঞ্চার করে।
আমরা জানি জলজ পরিবেশ-মণ্ডলেই একটি কোষের মাধ্যমে (যেমন- অ্যামিবা) পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উৎপত্তি। বিকাশ-বৃদ্ধি-বির্বতন ও বিস্তৃতি নদী তার প্রবাহ দ্বারাই করে। যেখানে নদী নেই সেখানে প্রাণের সৃষ্টি বা বিস্তৃতি নেই। প্রবাহের মাধ্যমে শুধুই পানি বহন করে না- হয় অসংখ্য জৈব-অজৈব পুষ্টি উপাদান আর লক্ষ-কোটি প্রাণের প্রবাহ। আর ছড়িয়ে পড়ে নদীকূল আশপাশে সমস্ত অঞ্চল। তাই তো ঊষর থেকে উর্বর করে তোলে আমাদের মৃত্তিকা। আমাদের ভূতল হয়ে ওঠে যেন প্রচণ্ড প্রজননক্ষম এক মাতৃকা। আর তাই বলতে পারি- শিরা, উপশিরার মত ছড়িয়ে, ছিটিয়ে থাকা নদীগুলোর কারণে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। সারাবছর কম-বেশি জলপ্রবাহ থাকায় নদীগুলো হয়ে ওঠেছে লক্ষ প্রাণের এক, একটি গতিময় অভয়ারণ্য।

শুধু তাই নয় এই মিঠাপানির আধারগুলো ঘিরে অসংখ্য ক্ষুদ্র অমেরুদন্ডী প্রাণী, মাছ, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী; বৈচিত্র্যময় বনভূমি কত-শত প্রাণের আবাসস্থল। আমাদের মিঠাপানির মৎস্যসম্পদের প্রধান উৎসই নদীগুলো। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২শ ৬০টি প্রজাতির দেশী মাছ পাওয়া যায় বাংলাদেশের নদীগুলোতে। দেখা যায় তার বুকে স্তন্যপায়ী শুশুক, ভোঁদড়। নদীতে শামুক, ঝিনুক মেলে। খাদ্যের সন্ধানে তীর ও জেগে ওঠা চরে এসে ভীড় করে বক, পানকৌড়িসহ নানা জাতের পাখি। নদী না থাকলে এই বৈচিত্র্যময় জীবমণ্ডল বিলিন হয়ে যাবে নিমিষেই।
পৃথিবীর ছয় প্রকারের ইকোসিস্টেমস বা বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণ বৈচিত্রময় বাস্তু সংস্থানতন্ত্র বলা হয় নদী বা মিঠা পানির উৎসকে। ২০১৯ সালে ৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের দেশের মহামান্য হাইকোর্ট একটি রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা (লিভিং এনটিটি)’ বলে আদেশ জারি করেছে। এর আগে নিউজিল্যান্ড, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
নদী শুধু নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য নয় এর সাথে আছে আমাদের বেঁচে থাকার খাবার, জীবিকা ও জীবন-সংস্কৃতি। বাঙালির সারাজীবনের সম্পর্ক। বাংলার বুকচিরে বহমান স্রোতস্বিনী নদী, চলমান নৌকা, জেলেদের কর্মব্যস্ততা, পাড়ে শিশুদের দুরন্তপনা-বাংলার চিরায়ত রূপ। কৃষি ও পানীয় জলের নিশ্চয়তা এবং উর্বরা ভূমির কারণে পৃথিবীর আদি সভ্যতাগুলোও নদী তীরেই গড়ে ওঠে। কোনো নদীর টিকে থাকার উপর নির্ভর করছে কোন সভ্যতা জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব।
আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নন্দাহার নামের ছোট্ট নদী ৯০ দশকেও সারা বছর জল থাকতো। আশ্বিন-কার্তিক এমনকি চৈত্র বৈশাখ মাসেও ঐ এলাকায় হাটে মুখে মুখে প্রচার করে পরেরদিন আশেপাশে গ্রামের সকল মানুষ একসাথে সারিবদ্ধ হয়ে চাবি-জাল, খেওয়া জাল, পলই দিয়ে মাছ ধরার উৎসব পালন করা হতো। আমাদের অঞ্চলে এটাকে হাওড়ি বলে। যখনই কেউ বড় মাছ ধরতো শতশত মানুষের হৈ হৈ সাড়া পড়ে যেতো। কি কাদা মাখানো, কাদা ছিটানো! এ এক অন্যরকম আনন্দোচ্ছ্বাস! অন্যদের মাছধরার স্পৃহাও বেড়ে যেতো। নদীতে বছরজুড়ে পানি, মাছ ছিল বলেই এমন আনন্দ-উৎসব। শরীর যেমন- আনন্দ চায়, তেমনই নদী দেশকে আনন্দ-উৎসব-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ করে।
বর্ষা মৌসুমে নদী ভরে তখন সেই নদীর মাছ খারি নালার মাধ্যমে ছড়িয়ে পরত মাঠে-ঘাটে। এই মাঠের মাছ, আমন ধান রোপনে হাল চাষের সময়ও হালের পিছু পিছু কতশত মাছ ধরেছি। আবার সেই ধানের জমি বিশেষকরে নিচু জমিতে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত মাছ পাওয়া যেত। আজ সেই নদী আর নদী নেই। উপজেলা হতে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাছ চাষের নামে লিজ দেয়া হয়েছিল। তারা খানিক দূরে দূরে নদীর মাঝ বরাবর বাঁধ দিয়ে বর্ষা মৌসুম শেষে বছরের কিছু সময় মাছ চাষ করত। বাঁধ দেয়ার ফলে নদীর পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলো। কচুরিপানা, ক্ষদিপানাসহ শ্যাওলা, আগাছা, আর্বজনা আটকা পরে গেল। আবার এই কচুরিপানার উপরদিয়ে আগ্রাসী আশামলতা আগাছা ছেয়ে গেছে পুরো নদী। এখন পানিই দৃষ্টিগোচর হয় না।
ফলে মাছসহ কোন জলজ প্রাণীই টিকতে পারে। আর আগাছা জমতে জমতে ভরা বর্ষা মৌসুমে পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাছাড়া খরার সময় অন্যান্য নদীর মতই পানি শূন্য চারণভুমিতে পরিনত হয়। একটা নদীকে যেন গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র এখন নদী বলে মনে করে করে না। এ দৃশ্য শুধু আমাদের নন্দাহার নদীই নয়। দেশের প্রায় সব ছোট নদীর একই অবস্থা। ফলে দেশে জীববৈচিত্র্যের যে- ব্যাপকহারে হানি হয়েছে, তা বিষদ গবেষণা না করেই বলা যায়। আন্তর্জাতিক এক বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত প্রজাতির মধ্যে উভচর প্রাণীরা সর্বোচ্চ (৪১%) হুমকির মধ্যে রয়েছে।

কিন্তু আজ জয়পুরহাটের আমাদের সেই “নন্দাহার নদী” এখন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায়। বাংলাদেশে নদীর চূড়ান্ত তালিকা তৈরীতে ২০২৩ সালের আগষ্ট মাসে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন খসড়া তালিকা থেকে বাদ পরা কোন নদী তালিকাভূক্ত করতে তথ্য উপাত্ত দিয়ে অভিযোগের আহবান করা হয়। এর প্রেক্ষিতে তথ্য উপাত্ত দিয়ে তালিকা তৈরীতে আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া “নন্দাহার নদী” তালিকাভুক্ত করার জন্য অনুরোধ জানাই।
এরপর উক্ত কমিশন কর্তৃক পত্র ইস্যু করলে জেলা, উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরকে পুনরায় তথ্য উপাত্ত প্রদান করি এবং আবারও কমিশনে ই-মেইল করি। আরও উল্লেখ করি এ নদীর সাথে আছে মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (শাসনকাল ১৪৯৩-১৫১৯) এর এই অঞ্চলের আগমের ইতিহাস। সর্বশেষ ১লা বৈশাখ, ১৪৩২ (১৪ই এপ্রিল, ২০২৫) এ বাংলাদেশের নদ-নদীর তালিকা প্রকাশ করে যাতে বাংলাদেশে নদনদীর সংখ্যা ১৪১৫ টি । তালিকার ৬৭৪ ক্রমিকে ‘নন্দাহার’ নদীটির দৈর্ঘ্য ১০ কি.মি. । উৎস আক্কেলপুর উপজেলার সোনামুখী (তুলসীগঙ্গা নদী) ও পতন স্থল কাঁঠালবাড়ি (হলহলিয়া ব্রিজের নিকট – তুলসীগঙ্গা নদী)। আমি দৃঢ় আশাবাদী ছিলাম। ইতিহাস, ঐতিহ্যের ধারণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এই নদী নিশ্চয়ই চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে। নইলে ভূমিদস্যুরা দখল দূষণে শেষ করবে। জীবন ও জীবীকা বিধ্বস্ত হবে অদূর ভবিষ্যতে!
উল্লেখ্য ৯ আগস্ট, ২০২৩ তারিখে দেশের সব নদ-নদীর একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছিল নদী রক্ষা কমিশন। ওই তালিকায় নদ-নদীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৯০৭টি। সর্বশেষ নতুন ৫০৮টি যুক্ত হয়ে নদনদীর সংখ্যা এখন ১৪১৫ টি। নিশ্চয় এটা ভালো কিছুর আশাব্যঞ্জক বিষয়।
তবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকাভূক্ত হলেই নদী রক্ষা পাবে তা নয়। নদী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেশের আইনসমূহ ও ব্যবস্থাপনার অস্তিত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের নদ-নদীর তীরভূমি, ফোরশোর ও প্লাবনভূমিতে অবৈধ দখলসহ অবৈধ কাঠামো নির্মাণ, নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প কারখানা কর্তৃক সৃষ্ট নদী দূষণ প্রতিরোধে ও পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণার্থে হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং ৩৫০৩/২০০৯ তে প্রদত্ত রায়ের আদেশ অনুসরণে সরকার- জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন-২০১৩ জারী করেছে।
এ আইন বলেই ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’ ৫ আগষ্ট, ২০১৪ তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও তালিকা প্রণয়ন ছাড়া তেমন কিছু দৃশ্যমান নাই। এর পর আবার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সংশোধিত আইন-২০২০ (খসড়া) প্রণয়ন হয়েছে। এর পরও নদী দখল দূষণ প্রতিরোধে, উদ্ধারে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কোন উন্নতি নেই। আবার এই আইন পরিপূর্ণ কিনা প্রশ্ন এসে যায়। নদী ও এর পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণার্থে- বর্জ্য নিষ্কাশনে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (২০১০-এ সংশোধিত)-এ, পানি আইন ২০১৩ সহ অন্যান্য ফৌজদারী আইনের সংযুক্তের প্রয়োজন হয়।
তবে নানা আইনী বিধি বিধানে কিছু প্রতিশ্রুতি অঙ্গীকার ও বিধিনিষেধ আছে যার বেশিরভাগই যথেষ্ট কার্যকর নয়, তার অসম্পূর্ণতা বা অস্বচ্ছতার কারণে কিংবা প্রয়োগ না করার কারণে- দখল-দূষণকারী ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসে। জেলা-উপজেলার, পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর ওয়েবসাইটসমূহে নদ-নদীর সঠিক তালিকাও সংযুক্ত নেই। নেই এসম্পর্কিত বিধিবিধানের প্রকাশ, নেই প্রচারণা। ফলে জন-সচেতনতা সৃষ্টি, জন-নজরদারীর সুযোগও সংকীর্ণ।
যে নদী এককালে দেশীমাছের জীন ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হতো। বর্ষা মৌসুমে মাছসহ জলজপ্রাণী ছড়িয়ে পরত দেশের আনাচে-কানাচে। যেন জীবমণ্ডলকে উজ্জীবিত করে ছড়িয়ে দিত দেশের সমস্ত প্রান্তে। তাই দেশকে জীবন্ত রাখতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে প্রকৃত দায়িত্বশীল অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সেইসাথে নদ-নদী দখল-দূষণ রোধে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে, গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ, অর্থনৈতিক উন্নতির এবং অস্তিত্ব রক্ষায় সচেতন ব্যক্তি, সমাজ, সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : কৃষিবিদ, কলাম লেখক ও ‘দেশীগাছ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আন্দোলন’ এর উদ্যোক্তা।