ঢাকাশনিবার , ৭ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

রক্তনালী-হৃৎপিণ্ডে জমছে প্লাস্টিক, বাড়ছে স্ট্রোকের ঝুঁকি

হাসান মাহমুদ
মার্চ ৭, ২০২৬ ৮:১১ অপরাহ্ণ । ৪২ জন

মানুষের রক্তনালী এবং হৃৎপিণ্ডের টিস্যুতে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা বা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ জমে যাচ্ছে, যা অকাল হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৪ সালে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় এলেও পরবর্তীতে প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক ফলো-আপ গবেষণায় এই ঝুঁকির ভয়াবহতা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এটি এখন কেবল পরিবেশ দূষণ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ‘নীরব মহামারি’ যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এক চরম অশনিসংকেত।

২০২৪ সালের প্রাথমিক গবেষণায় কেবল ধমনীতে প্লাস্টিক খুঁজে পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয় হার্ট জার্নাল-এ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি প্রকাশিত একটি ফলো-আপ মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, ন্যানোপ্লাস্টিক (মাইক্রোপ্লাস্টিকের চেয়েও ছোট কণা) সরাসরি মানুষের হৃৎপিণ্ডের কোষের ভেতরে প্রবেশ করে কোষের মৃত্যু ঘটাতে পারে।

ইতালির ক্যাম্পানিয়া লুইগি ভ্যানভিটেলি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক ড. রাফায়েল মার্চেলা তার গবেষণার ধারাবাহিকতায় বলেন, ‘আমরা রোগীদের রক্তনালীতে কেবল চর্বি নয়, বরং পলিথিন ও পিভিসি-র কণা পেয়েছি। এই প্লাস্টিক কণাগুলো রক্তনালীর ভেতরে এক ধরনের তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা সাধারণ চিকিৎসার মাধ্যমে সারানো প্রায় অসম্ভব।’

২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড (ইউসিআর) থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরুষদের ধমনীতে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে নারীদের তুলনায় অনেক বেশি ত্বরান্বিত করে। এই গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারসপেক্টিভস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ড. চ্যাংচেং ঝো বলেন, ‘প্লাস্টিক থেকে নির্গত থ্যালেট জাতীয় রাসায়নিকগুলো রক্তনালীর স্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য ব্যাহত করে সরাসরি হৃদযন্ত্রের পেশিকে দুর্বল করে ফেলে।’ এই রাসায়নিক বিক্রিয়াটি রক্তচাপকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা অল্প বয়সেই হৃদরোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চের শুরুতে প্রকাশিত কয়েকটি চিকিৎসা নিবন্ধে বলা হয়েছে, রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি কেবল হার্ট অ্যাটাক নয়, বরং রক্ত জমাট বাঁধার গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা স্ট্রোকের প্রধান কারণ।

দ্যা বিএমজে (ব্রিটিশ মেডিকেল র্জানাল)-এ ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের বোতলে পানি পান এবং প্লাস্টিকের কাপে গরম চা খাওয়া শরীরকে প্লাস্টিক কণার আধার বানিয়ে ফেলছে। গরম পানীয়ের সংস্পর্শে এলে প্লাস্টিকের দেয়াল থেকে কোটি কোটি ক্ষুদ্র কণা পানীয়ের সাথে মিশে যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক এই ভয়াবহ গবেষণার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের চিত্রটি আরও আতঙ্কজনক। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুনর্মূল্যায়িত দেশীয় গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের অন্ত্র ও পেশিতে প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। যেহেতু বাঙালিরা ইলিশের প্রায় সব অংশই (মাথা, অন্ত্র, ডিম) খায়, তাই এই প্লাস্টিক কণাগুলো সরাসরি আমাদের রক্তে মিশে হৃদপিণ্ডের ক্ষতি করছে। সমুদ্র ও নদীর দূষিত প্লাস্টিক বর্জ্য এখন মাছের মাধ্যমে আমাদের ডাইনিং টেবিলে ফিরে এসে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি কেন চরমে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশে গত এক দশকে অকাল হার্ট অ্যাটাক বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্লাস্টিকের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ফুটপাতের চায়ের দোকানে প্লাস্টিকের কাপে গরম চা এবং রেস্টুরেন্টে পলিথিনে মোড়ানো গরম খাবার সরাসরি শরীরে কোটি কোটি প্লাস্টিক কণা ঢুকিয়ে দিচ্ছে।’ এছাড়া সিন্থেটিক কাপড় ধোয়ার সময় নির্গত ক্ষুদ্র মাইক্রোফাইবার বা আঁশ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসে প্রবেশ করে স্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করছে।

জনস্বাস্থ্য এবং প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীসহ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অদৃশ্য বিপদ থেকে বাঁচতে হলে এখনই ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্লাস্টিক বর্জন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কাঁচ বা স্টিলের পাত্রে খাবার খাওয়া, সিন্থেটিক কাপড়ের বদলে সুতির পোশাক ব্যবহার করা এবং প্লাস্টিক বোতলের পানির বদলে পরিশোধিত ফিল্টারের পানি পান করা জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। অন্যথায়, আগামী কয়েক দশকে হৃদরোগের প্রধান কারণ হিসেবে চর্বি বা উচ্চ রক্তচাপকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ।

তথ্যসূত্র: নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন, ইউরোপীয় হার্ট জার্নাল (২০২৫), ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (২০২৬) এবং পবা’র গবেষণা প্রতিবেদন।