একটি গ্রামের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়া, কিংবা শহরের ব্যস্ত অফিসে ছোট্ট বিরতিতে কয়েক মিনিট মোবাইল স্ক্রল করা—আজকের দিনে এ দুটি অভ্যাসের সঙ্গে ফেসবুকের নাম জড়িয়ে আছে অবিচ্ছেদ্যভাবে। কখনো খবরের কাগজ পড়ার জায়গা নিয়েছে এটি, কখনো আবার মনের খাতা খুলে দেখার জানালা হয়ে উঠেছে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক বিতর্ক, বিনোদন, কিংবা ব্যবসা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ফেসবুক। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি প্রভাব বিস্তার করেছে, তবে ব্যবহারকারীর দিক থেকে কিছু দেশ বিশেষভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
Statista–র ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীর দেশ ভারত। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ আরও কয়েকটি দেশ। এই তথ্য কেবল সংখ্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে বোঝা যায় কিভাবে ফেসবুক মানুষের জীবনে ঢুকে পড়েছে। এবার একে একে দেখা যাক শীর্ষ ১০ দেশের অবস্থান।
ভারত: ডিজিটাল সংযোগের মহাসমুদ্র
ভারতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫৮২ মিলিয়ন, যা গোটা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। জনসংখ্যার বিশালতার কারণে এই সংখ্যা অনেকটাই প্রত্যাশিত। স্মার্টফোন ও সুলভ ইন্টারনেট প্যাকেজের বিস্তারের ফলে গ্রামীণ এলাকা থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি প্রান্তে ফেসবুক ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি থেকে বিনোদন—সবকিছুতেই ফেসবুককে ব্যবহার করছে। একইসাথে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রচারেও ফেসবুক এক অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র: জন্মভূমিতে ফেসবুকের প্রভাব
২৮০ মিলিয়ন ব্যবহারকারী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ফেসবুক ব্যবহারে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এখানেই ২০০৪ সালে ফেসবুকের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর আজও এটি অন্যতম জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে নানা বিতর্কও রয়েছে—ভুয়া তথ্য ছড়ানো, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো কিংবা তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব। তারপরও আমেরিকানরা ব্যক্তিগত সংযোগ রক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ফেসবুক ব্যবহার করছে ব্যাপকভাবে।
ইন্দোনেশিয়া: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল দিগন্ত
২০২ মিলিয়ন ব্যবহারকারী নিয়ে ইন্দোনেশিয়া তালিকার তৃতীয় স্থানে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশে ফেসবুক কেবল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং ব্যবসা ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ফেসবুকের মাধ্যমে বিশাল বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে। তরুণ সমাজ তাদের মতামত, জীবনধারা ও সংস্কৃতি প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও ফেসবুককে বেছে নিচ্ছে।
ব্রাজিল: বিনোদন আর সামাজিক আলোচনার মিশ্রণ
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১৩ মিলিয়ন। ফুটবল, সংগীত, আর সাংস্কৃতিক নানা উৎসব ফেসবুককে সেখানে রঙিন করে তুলেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও ফেসবুক ব্রাজিলীয়দের কাছে মতপ্রকাশের অন্যতম জায়গা হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সবাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করতে ফেসবুক ব্যবহার করছে।
মেক্সিকো: পরিবার ও সমাজের ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি
মেক্সিকোয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯২ মিলিয়ন। দেশটির মানুষ পরিবারকেন্দ্রিক, আর সেই পরিবারিক বন্ধনও ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিনোদন ও ব্যক্তিগত সংযোগের পাশাপাশি মেক্সিকোয় ফেসবুক রাজনৈতিক আলোচনা ও সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ফিলিপাইন: অনলাইন সংস্কৃতির বিস্ময়
ফিলিপাইনের ৮৮ মিলিয়ন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার বিশাল অংশ। ফিলিপিনো জনগণ অনলাইনে সক্রিয়তার জন্য পরিচিত, আর ফেসবুক তাদের জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রবাসী ফিলিপিনোদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ফেসবুক প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভিয়েতনাম: তরুণদের হাতে ডিজিটাল শক্তি
৭৫ মিলিয়ন ব্যবহারকারী নিয়ে ভিয়েতনামও তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে। দেশটির দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং তরুণ প্রজন্মের অনলাইন সক্রিয়তা ফেসবুককে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ব্যবসা ও শিক্ষা খাতেও ফেসবুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ: পরিবর্তনের সেতুবন্ধন
বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৬ মিলিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছে। দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফেসবুক এখন খবর আদান-প্রদানের অন্যতম মাধ্যম। তরুণদের বিনোদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনলাইন শিক্ষা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ—সব ক্ষেত্রেই ফেসবুক শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। এক অর্থে বাংলাদেশের ডিজিটাল সংযোগের প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি।
থাইল্যান্ড: সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন
৫০ মিলিয়ন ব্যবহারকারী নিয়ে থাইল্যান্ড তালিকার নবম স্থানে। দেশটির পর্যটন শিল্প, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রা ফেসবুককে বিশেষ রঙ দিয়েছে। থাই নাগরিকরা ব্যক্তিগত জীবন শেয়ার করা ছাড়াও ব্যবসা প্রচারে ফেসবুক ব্যবহার করছে।
পাকিস্তান: সংযোগের চ্যালেঞ্জ আর সম্ভাবনা
৪৭ মিলিয়ন ব্যবহারকারী নিয়ে পাকিস্তান তালিকার দশম স্থানে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেও ফেসবুক দেশটিতে মানুষের সংযোগের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। তথ্য প্রচার, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বিনোদনের ক্ষেত্রে ফেসবুকের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।
ফেসবুক আজ শুধু একটি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ নয়, বরং বৈশ্বিক সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার কেবল যোগাযোগের জন্য নয়, বরং অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিনোদনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ভারত থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত, নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা পর্যন্ত—ফেসবুক মানুষকে এক অদ্ভুত ডিজিটাল সুতোয় গেঁথে রেখেছে।


