
শহরের ইট-কাঠের খাঁচায় বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেওয়া আজ একরকম বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত কলকারখানার ধোঁয়া, ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর ধুলাবালির কবলে পড়ে আমাদের ফুসফুস মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। বায়ুদূষণের এই ভয়াবহ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এখন আর হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নেই। সি৪০ (C40) নলেজ হাবের সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শহরগুলোর নীতিনির্ধারকরা যদি এখনই সাহসী ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেন, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই বায়ুর মানে দৃশ্যমান উন্নতি আনা সম্ভব। আর এই লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বজুড়ে শহরগুলোর জন্য ৬টি মূল ও অত্যন্ত কার্যকর কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমত, শহরকে দূষণমুক্ত করতে হলে সবার আগে শত্রু বা দূষণের উৎসকে স্পষ্টভাবে চিনতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত বায়ুমানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নিতে হবে শহরগুলোকে। এই উদ্দেশ্যে কম খরচে পাওয়া আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তির সাহায্যে শহরের বাতাসের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি। আবহাওয়ার খবরের মতো নিয়মিত নাগরিকদের কাছে দূষণের মাত্রা প্রকাশ করতে হবে এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। কোন খাত থেকে সবচেয়ে বেশি দূষণ ছড়াচ্ছে—যেমন যানবাহন, ভবন নাকি বর্জ্য পোড়ানো—তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পেট্রোল ও ডিজেল চালিত যানবাহনের কালো ধোঁয়া শহরবাসীর জীবন ওষ্ঠাগত করে তুলছে। এর মোকাবিলায় শহরের বড় একটি অংশকে ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি শূন্য-নির্গমন এলাকায় রূপান্তর করতে হবে। সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘ক্লিন এয়ার জোন’ বা পরিচ্ছন্ন অঞ্চল ঘোষণা করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট এলাকায় মানহীন যানবাহনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা অথবা উচ্চহারে এন্ট্রি ফি বা টোল ধার্য করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তৃতীয়ত, রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির আধিপত্য কমিয়ে জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে হবে। রাস্তার একটি বড় অংশ বাস, সাইকেল চালক ও পথচারীদের জন্য সংরক্ষিত করতে হবে। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আকর্ষণীয় গণপরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদচারী-বান্ধব এলাকা এবং সাইকেল শেয়ারিংয়ের আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। এর পাশাপাশি আবাসন ও পরিবহন কৌশল সমন্বয় করে এমনভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে যেন মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন হাঁটার দূরত্বের মধ্যেই মেটানো যায়।
চতুর্থত, পরিবহন খাত থেকে কার্বন ও ধোঁয়া কমানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা জরুরি। এর অংশ হিসেবে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার নিজস্ব বহরে শতভাগ বৈদ্যুতিক বা শূন্য-নির্গমন বাস ও অন্যান্য গাড়ি কেনা নিশ্চিত করতে হবে। শহরে পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক যান চার্জিং স্টেশন তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষকে ইভি ব্যবহারে কর ছাড় বা বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে উৎসাহিত করতে হবে। এই রূপান্তর যাতায়াত ব্যবস্থাকে যেমন পরিবেশবান্ধব করবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খরচও কমাবে।
পঞ্চমত, শহরের সার্বিক শক্তির উৎসকে পরিবেশবান্ধব করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। ২০৩০ সালের মধ্যে শহরের পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে শতভাগ নবায়নযোগ্য শক্তিতে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে কার্বনমুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া উচিত। নতুন ভবনে সোলার প্যানেল বসানো বাধ্যতামূলক করা এবং সরকারি স্থাপনাগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। শহরগুলো তাদের নিজস্ব ক্রয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে পরিচ্ছন্ন শক্তির জোগান বাড়াতে পারে।
ষষ্ঠত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রান্নার জ্বালানির অব্যবস্থাপনা বায়ুদূষণের আরেকটি বড় কারণ। খোলা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো চিরতরে বন্ধ করতে আধুনিক ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা দরকার। অস্বাস্থ্যকর ও কঠিন জ্বালানির পরিবর্তে রান্নার কাজে পরিষ্কার ও সাশ্রয়ী বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করার নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
এই ৬টি পদক্ষেপ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত; যেমন—ক্লিন এয়ার জোনে টোল আদায় করলে ব্যক্তিগত গাড়ি কমে এবং সেই অর্থ দিয়ে গণপরিবহনের উন্নয়ন করা সম্ভব হয়। শহরের নেতৃত্ব যদি এই সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থাগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে, তবে অচিরেই আমাদের শহরগুলো হয়ে উঠবে আরও স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য।