বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ (NCD) এখন নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১০–১২ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, আর প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এদের একটি বড় অংশই নিজেদের রোগ সম্পর্কে অবগত নন বা নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় নেই। এরই মধ্যে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে, যার বড় অংশ ঘটে অকালমৃত্যুর মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে খাদ্যাভ্যাসের বড় পরিবর্তন একটি প্রধান কারণ। নগরায়ন, ব্যস্ত জীবনযাপন এবং সহজলভ্য প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারণে মানুষ অজান্তেই অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বি গ্রহণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে সচেতনতা বাড়াতে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন সহজ করতে প্যাকেটজাত খাবারে ফ্রন্ট অব প্যাক (Front-of-Pack) লেবেলিং চালু করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং কী?
ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (Front-of-Pack Labeling) হলো খাদ্যপণ্যের প্যাকেটের সামনের অংশে সহজভাবে দৃশ্যমান সতর্কবার্তা বা তথ্য প্রদর্শনের একটি পদ্ধতি। এতে স্পষ্টভাবে জানানো হয় কোনো খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি আছে কিনা, যাতে ভোক্তারা দ্রুত ও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
যেমন, কোনো চিপসের প্যাকেটে সামনে লাল চিহ্ন দিয়ে লেখা থাকতে পারে “অতিরিক্ত লবণ”, অথবা কোনো জুসের প্যাকেটে “উচ্চ চিনি” উল্লেখ থাকতে পারে। আবার কিছু দেশে ট্রাফিক লাইটের মতো সবুজ, হলুদ ও লাল রঙ ব্যবহার করে বোঝানো হয় কোন উপাদান নিরাপদ আর কোনটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে মানুষ ক্রমেই বাইরে তৈরি ও প্যাকেটজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। এসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও প্রাণিজ চর্বির উপস্থিতি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বলেন “মানুষ অনেক সময় না জেনেই ক্ষতিকর উপাদান বেশি গ্রহণ করছে। প্যাকেটের গায়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে তারা সচেতন হবে,”।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগের যে “বিশাল পাহাড়” তৈরি হয়েছে, তা কমাতে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি এটি মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। তবে কার্যকর ফল পেতে হলে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিবেশ আইনজীবী ও সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ)-এর অনারারি সম্পাদক সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং ভোক্তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি উপায়। তিনি বলেন “বিশ্বব্যাপী এখন পণ্যের সামনের দিকে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে ক্রেতা সহজেই বুঝতে পারে খাবারটি তার জন্য ক্ষতিকর কিনা,”। বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
জনস্বাস্থ্য ও নীতিবিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত চিনি ও লবণ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্যাকেটের সামনে যদি স্পষ্টভাবে সতর্কবার্তা থাকে, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা সহজেই এসব খাবার এড়িয়ে চলতে পারবেন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ বর্তমানে তাদের মধ্যেও অসংক্রামক রোগ বাড়ছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টারের সহকারী গবেষক ডা. আহমেদ খায়রুল আবরার বলেন, অসংক্রামক রোগ দেশের অর্থনীতি ও সমাজে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। অনেক মানুষ স্বাভাবিক আয়ুষ্কালের আগেই মারা যাচ্ছে, যা একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগুণ সংক্রান্ত তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা কঠিন। প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা তথ্য ও জটিল উপস্থাপনার কারণে ভোক্তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং, যেখানে সরাসরি বলা থাকবে খাবারটিতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে কিনা।
গ্লোবাল অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, বর্তমানে প্যাকেটজাত খাদ্যের লেবেলিং অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক নয় এবং তথ্যগুলোও স্পষ্ট নয়। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ৫ গ্রাম (প্রায় এক চা চামচ) লবণ গ্রহণ করা উচিত, কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এর দ্বিগুণ গ্রহণ করছেন, যা উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ। একইভাবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রাফিক লাইট বা সতর্কবার্তাভিত্তিক লেবেলিং চালু রয়েছে, যা ভোক্তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশেও যদি বাধ্যতামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে মানুষ সহজেই বুঝতে পারবে কোন খাবারটি স্বাস্থ্যসম্মত আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক তাইফুর রহমান বলেন, ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং চালু হলে সাধারণ ভোক্তারা সরাসরি উপকৃত হবেন। এতে প্যাকেটজাত খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ সহজেই যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে দ্রুত নীতিমালা চূড়ান্ত করতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসক বাড়িয়ে অসংক্রামক রোগ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (preventive measures) গ্রহণ করা। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা এবং প্যাকেটজাত খাদ্যের উপাদানগুলো স্পষ্টভাবে মোড়কে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অসংক্রামক রোগের বাড়তি চাপ মোকাবেলায় এখনই কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। দ্রুত এটি আইনের আওতায় এনে বাস্তবায়ন করা গেলে জনসচেতনতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।


