ঢাকামঙ্গলবার , ৩ মার্চ ২০২৬

ধূমপানের অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছেন ৯৩ শতাংশ কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৩, ২০২৬ ৪:৩৬ অপরাহ্ণ । ৩২ জন

দেশের গণপরিবহনে ধূমপানের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিশেষ করে পরিবহনের ভেতরে ধূমপানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলে ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রে চালক বা হেলপাররা পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে একটি বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আজ (৩ মার্চ) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র-এর সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠনে গণপরিবহনে ধূমপানের ঘটনা বন্ধে আইন শক্তিশালী করার পাশাপাশি কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি বলে বক্তারা মন্তব্য করেন। ডেভলপমেন্ট এ্যাকটিভিটিস অব সোসাইটি (ডাস) এবং বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা)-এর যৌথ উদ্যোগে “গণপরিবহনে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের অবস্থা বিষয়ক কমপ্লায়েন্স মনিটরিং সার্ভের ফলাফল প্রকাশ” শীর্ষক এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

ডাস্-এর টিমলিড আমিনুল ইসলাম বকুল এর সভাপতিত্বে এবং ডাস্-এর প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী মোয়াজ্জেম হোসেন টিপুর সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সিনিয়র সচিব ও ভাইটাল স্ট্রাটেজিস-এর সিনিয়র কারিগরি পরামর্শক হামিদুর রহমান খান এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সাবেক সমন্বয়কারী হোসেন আলী খোন্দকার। এছাড়া আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নীতি বিশ্লেষক সৈয়দ মাহাবুবুল আলম তাহিন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি এড. আওলাদ হোসেন প্রমুখ। সভায় গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন ডাস্ এর কনসালটেন্ট আসরার হাবিব নিপু। সভায় আরো বক্তব্য রাখেন নাটাব এর প্রকল্প পরিচালক ফিরোজ আহমেদ, বিইআর-এর প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল, এইড ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রকল্প কর্মকর্তা আবু নাসের অনিক, ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের সিনিয়র প্রকল্প কর্মকর্তা সামিউল হাসান সজীব, টিসিআরসি’র প্রোগ্রাম অফিসার জুলহাস আহমেদ প্রমুখ।

ডাস্ পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা যায়, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ অনুযায়ী গণপরিবহন, বাস টার্মিনাল ও নদীবন্দর ধূমপানমুক্ত ঘোষিত হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলাফলে বেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি উঠে আসলেও টার্মিনাল এলাকায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখা গেছে।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী, যাত্রীদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বেসলাইন জরিপে যাত্রীদের মধ্যে ধূমপায়ীর হার ছিল ৪৩.৯৭ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে ৩৭.৯৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ৮০ শতাংশের বেশি যাত্রী মনে করেন, গত এক বছরে যানবাহনের ভেতরে ধূমপান কমেছে এবং ৯৭ শতাংশ যাত্রী ধূমপানমুক্ত গণপরিবহনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে ৭১ শতাংশ যাত্রী জানিয়েছেন, টার্মিনাল এলাকায় ধূমপানের পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ৫৪ শতাংশ যাত্রী ধূমপায়ীদের মুখোমুখি হতে সংকোচ ও সম্ভাব্য বিরোধের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তবে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ জানানো হলে ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিবহনকর্মীরা পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে যাত্রীরা উল্লেখ করেছেন, যা জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে। গবেষণার আরো উঠে এসেছে, দুর্বল আন্তঃসংস্থা সমন্বয়, অস্পষ্ট প্রয়োগ নির্দেশনা, জনসমাগমস্থলে ধূমপানকে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক মনে করা, পর্যাপ্ত জনবল ও জরিমানার সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি আইন বাস্তবায়নে বিশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে।

এসব সমস্যা সমাধানে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও যৌথ অভিযান জোরদার, দৃষ্টান্তমূলক জরিমানার ধারাবাহিক প্রয়োগ, চালক ও কন্ডাক্টরের দায়িত্ব নির্দিষ্টকরণ, যানবাহন লাইসেন্সিং ও পরিদর্শনে তামাক নিয়ন্ত্রণ শর্ত যুক্ত করা, যানবাহন ও টার্মিনালে স্থায়ী সাইনেজ স্থাপন, টার্মিনাল এলাকায় তামাক বিক্রয় ও ট্যাপস নিষিদ্ধকরণ, পরিবহনকর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব হামিদুর রহমান খান বলেন, গবেষণা অনুযায়ী বাসের ক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখা গেলেও নৌপথে অগ্রগতি বুঝতে হলে সড়ক ও নৌপথের জন্য পৃথকভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক হয়েই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে তামাকমুক্ত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। জনাব হোসেন আলী খোন্দকার বলেন, সম্প্রতি নৌ মন্ত্রণালয় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে একটি নির্দেশনা দিয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

বক্তারা আরো বলেন, আইনি বিধানকে কার্যকর করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, সমন্বিত তদারকি এবং দৃশ্যমান আইন প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। গণপরিবহন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, মালিকপক্ষ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশে ধূমপানমুক্ত গণপরিবহন নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে গণপরিবহনে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে এবং একটি স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে।