নীরবে, ধোঁয়ার মতো ধীরে ধীরে প্রতিদিন শত শত প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে তামাক। কোনো বিস্ফোরণ নেই, নেই কোনো আর্তচিৎকার-তবু ক্ষতির মাত্রা একটি বড় দুর্ঘটনার চেয়েও ভয়াবহ। এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান ও সদ্য জারি করা সংশোধন অধ্যাদেশের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ-২০২৫ এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসি) কর্তৃক আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি উল্লেখ করে বলেন, বিমান দুর্ঘটনায় যদি এত সংখ্যক মানুষ মারা যেত, আমরা স্তব্ধ হয়ে যেতাম। কিন্তু মৃত্যু এখানে নীরব, ধোঁয়ার মতো ধীরে আসে, আর আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তামাক খাত থেকে সরকার যেখানে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়, সেখানে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো ও অকাল মৃত্যুর কারণে ক্ষতি হয় ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়-এটি পরিবার ভেঙে যাওয়ার, স্বপ্ন নষ্ট হওয়ার ক্ষতি।
তিনি বলেন, এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ সংশোধন অধ্যাদেশ জারি করেছে। এটি শুধু একটি আইন নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের পক্ষে সরকারের দৃঢ় অবস্থান।
অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি আরও বলেন, এখন থেকে পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে তামাক বিক্রি করা যাবে না। সিনেমা, নাটক, ওটিটি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামাকের দৃশ্য প্রদর্শন বন্ধ করা হয়েছে। দোকানে তামাকের রঙিন প্যাকেট ঝুলিয়ে রাখাও নিষিদ্ধ। পাশাপাশি তরুণদের বিভ্রান্ত করতে ব্যবহৃত ই-সিগারেট ও ভ্যাপ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যদি একটি জীবনও বাঁচে, যদি একটি শিশুও নেশা থেকে ফিরে আসে-তবেই এই আইন ও উদ্যোগ সার্থক হবে বলে মনে করেন তিনি।
আইনের বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, আইন যেন কাগজে শক্ত হয়ে না থাকে, বাস্তবে কাজ করতে হবে। নীতি-নির্ধারক হলে বাস্তবায়নের দায় নিতে হবে, প্রশাসনে থাকলে চোখ বন্ধ রাখা যাবে না, সুশীল সমাজ ও মিডিয়াকে সত্য বলার চাপ তৈরি করতে হবে, আর অভিভাবকদের আগে নিজেদের ঘর ধূমপানমুক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৫৬৪ জন মানুষ তামাকজনিত কারণে মারা যাচ্ছেন। তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, তবে আগামী দিনের জন্য একজনকেও যদি বাঁচানো যায়-সেটাই আমাদের লক্ষ্য।
ভয় দেখিয়ে নয়, সচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমেই তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব-এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, মোবাইল কোর্ট দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মানুষ নিজে থেকে ‘না’ বললেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।
তিনি জানান, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ৩৪টি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করছে। স্কুলে ধূমপান নিষিদ্ধ, শিক্ষক নিয়োগে ধূমপায়ীদের অযোগ্য ঘোষণা, পাঠ্যবইয়ে তামাকবিরোধী বিষয় অন্তর্ভুক্তি, তামাক চাষে নিরুৎসাহিতকরণ এবং রেলওয়েকে ধূমপানমুক্ত করা-এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বীজ।
যুব সমাজকে লক্ষ্য করে তামাক কোম্পানির আগ্রাসনের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, কনসার্টে বিনামূল্যে সিগারেট বিতরণ ও গ্ল্যামারের মোড়কে নেশা ছড়ানোর বিরুদ্ধে নীরব থাকা যাবে না।
মতবিনিময় সভায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সদ্য প্রণীত এই জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সকল অংশীজনের সুচিন্তিত মতামত ও সুপারিশ আহ্বান করা হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, উপদেষ্টা জনাব নূরজাহান বেগম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান, বিশেষ সহকারী। সভায় সভাপতিত্ব করেন মো. সাইদুর রহমান, সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।


