২০২৫ সালের এপ্রিল, ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছিল একটি চাঞ্চল্যকর গবেষণা। সেখানে দাবি করা হয়েছিল যে উত্তর ইতালির নরওয়ে স্প্রুস গাছগুলো ২০২২ সালের আংশিক সূর্যগ্রহণের কয়েক ঘণ্টা আগে তাদের কোষীয় বৈদ্যুতিক সংকেত বা ‘ইলেক্ট্রোম’ সমন্বয় করতে শুরু করেছিল। খবরটি শিরোনাম হয়েছিল “কথা বলা গাছের বন” এবং তা দ্রুত সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।
গবেষণাটি সত্য হলে এটি উদ্ভিদদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংকেত বিনিময় বোঝার ক্ষেত্রে এক বড় বৈজ্ঞানিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হতো। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই রহস্যময় ঘটনা পরিবেশগত কারণে ঘটেছিল, সূর্যগ্রহণের সঙ্গে এর সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় বাস্তুসংস্থানবিদ এবং গবেষণার সহ-লেখক এরিয়েল নভোপ্লানস্কি বলেন, “গাছপালা পরিবেশের পরিবর্তনে অবশ্যই সাড়া দেয়। তারা আলোর পরিবর্তন, মাটির পুষ্টি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সংকেত বুঝতে পারে। তবে আংশিক সূর্যগ্রহণের মাত্র দুই ঘণ্টার আলো কমা তাদের আচরণে প্রাকৃতিক প্রস্তুতি তৈরি করতে যথেষ্ট নয়।”
গবেষণায় দেখা গেছে, ডলোমাইটসের ওই স্প্রুস গাছগুলো মূলত সাম্প্রতিক বজ্রঝড় এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত হয়েছিল। এই চার্জিংয়ের ফলে অদ্ভুত বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ দেখা গিয়েছিল, যা প্রথম গবেষণার লেখকরা ভুলভাবে সূর্যগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
প্রাথমিক গবেষণাটি ছিল সীমিত নমুনার ওপর ভিত্তি করে। সেখানে মাত্র তিনটি জীবন্ত গাছ এবং পাঁচটি মৃত গুঁড়ি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। নভোপ্লানস্কি বলেন, “এটি বৈজ্ঞানিক প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। অতি উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনামের কারণে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে, যা বাস্তব বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে বেশি কল্পনার মতো শোনায়।”
গাছপালা প্রকৃতপক্ষে আলোর মাত্রা, বর্ণালী পরিবর্তন এবং মাটির পুষ্টির ওপর সংবেদনশীল। এগুলো তাদের প্রতিযোগিতা, ছায়াপথ এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা বাড়ায়। তবে সূর্যগ্রহণ বা মহাকর্ষীয় পরিবর্তনের মতো ঘটনা এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে না।
২০২২ সালের আংশিক সূর্যগ্রহণটি একটি বিশেষ চক্রের অংশ ছিল, যা প্রতি ১৮ বছর ১১ দিন ৮ ঘণ্টা অন্তর ঘটে। ওই সময়ে আলোর মাত্রা প্রায় ১০.৫ শতাংশ কমেছিল, যা গাছের ব্যবহারের ক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। এছাড়া মেঘ ও আবহাওয়ার কারণে আলোর মান ও পরিমাণে যে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, তা অনেক বেশি। ফলে বড় গাছগুলো যদি আগের সূর্যগ্রহণ থেকে কোনো শিক্ষা নিতেও, পরবর্তী সূর্যগ্রহণের জন্য তারা নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস তৈরি করতে পারত না।
নভোপ্লানস্কি বলেছেন, “গাছের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ বাস্তব, কিন্তু এটি এখনো গবেষণার প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। কোনো অবৈজ্ঞানিক বা কাল্পনিক ব্যাখ্যা ছাড়াই বন নিজস্ব বৈশিষ্ট্যেই বিস্ময়কর।” গাছের বৈদ্যুতিক সংকেত এবং আলোর পরিবর্তনে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া মহাজাগতিক বা অতিপ্রাকৃত সূর্যগ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
এই গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, গাছপালা অতিরিক্ত কল্পনার প্রয়োজন ছাড়া নিজেদের অসাধারণ ক্ষমতা প্রদর্শন করে। নভোপ্লানস্কি মন্তব্য করেছেন, “ছদ্মবিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ এড়িয়ে গেলে প্রকৃত উদ্ভিদ বিজ্ঞান অনেক বেশি শিক্ষণীয় এবং বিস্ময়কর।” তাদের মতে, গাছের বাস্তব প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব বোঝার মাধ্যমে আমরা প্রকৃতিতে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে পারি।
তথ্যসূত্র: পপুলার সায়েন্স


