
সেপ্টেম্বর মাসে সারাদেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬৭৪ জন। নিহতদের মধ্যে ১৩৯ জনই মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী, যা মোট প্রাণহানির ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
রোববার (৪ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা-বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এ ছাড়া ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, যা মোট নিহতের ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
যানবাহনভিত্তিক হিসাবে, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন। বাসের যাত্রী নিহত হয়েছেন ২৬ জন। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্রলির আরোহী নিহত হয়েছেন ১৯ জন। মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের আরোহী নিহত হয়েছেন ২১ জন।
এ ছাড়া থ্রি-হুইলার, অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনার যাত্রী নিহত হয়েছেন ৮৮ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র ও টমটমের যাত্রী নিহত হয়েছেন ১৮ জন। বাইসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন ছয়জন।
সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। সেপ্টেম্বরে এসব সড়কে ১৭৮টি দুর্ঘটনা হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ১৪৫টি দুর্ঘটনা, যা মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯৮টি, পথচারীকে চাপা বা ধাক্কায় ১০৯টি এবং যানবাহনের পেছনে আঘাতের ঘটনায় ৬১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ছয়টি দুর্ঘটনা।
সময় অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে—মোট দুর্ঘটনার ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মাসজুড়ে সংঘটিত দুর্ঘটনায় মোট ৬৯১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৬২টি মোটরসাইকেল, ১২৯টি থ্রি-হুইলার, ১১৩টি বাস, ৯৩টি ট্রাক, ২৯টি কাভার্ডভ্যান, ১৭টি পিকআপ, ১২টি মাইক্রোবাস, ১৫টি প্রাইভেটকার, আটটি অ্যাম্বুলেন্স, পাঁচটি জিপ ও ৪৬টি অজ্ঞাত যানবাহন রয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রামে মোট দুর্ঘটনার ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ ও প্রাণহানির ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, খুলনায় যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৪২ ও ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ১২ দশমিক ২১ ও ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে।
বরিশালে দুর্ঘটনার হার ৫ দশমিক ২০ শতাংশ এবং প্রাণহানি ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। সিলেটে এ হার যথাক্রমে ৪ দশমিক ৫২ ও ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, রংপুরে ৫ দশমিক ৬৫ ও ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৭ দশমিক ২৩ ও ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ।
সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে গাজীপুরে—৩৮ জন। রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বরে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৮ জন শিক্ষার্থী, ২৪ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ২৫ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী, ১৮ জন এনজিওকর্মী, ১৪ জন দিনমজুর ও ১৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। এ ছাড়া ব্যাংক-বীমার কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১ জন, পোশাকশ্রমিক ছয়জন, প্রকৌশলী চারজন, মোটর মেকানিক চারজন, সাংবাদিক তিনজন, মসজিদের ইমাম বা খাদেম তিনজন, পুলিশ সদস্য দুজন এবং চিকিৎসক দুজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া সেনা সদস্য, কাস্টমস কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী একজন করে এবং একজন বিদেশি নাগরিকও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
সেপ্টেম্বরে সড়কের পাশাপাশি নৌ ও রেলপথেও প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময়ে ১১টি নৌদুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত ও চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির মতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এ কারণে গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা।
সংস্থাটি আরও বলেছে, যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা এবং শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এ ছাড়া নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাবকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।