সরকার সম্প্রতি জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তি হলো—বাজেটের চাপ কমানো এবং সরকারি ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এটি শুধু আর্থিক চাপ কমানোর জন্য নয়; বরং এটি আইএমএফ ও বিদেশি ঋণ শর্তের অংশ। এই সিদ্ধান্ত সরাসরি সাধারণ মানুষের আয়ের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলছে।
সঞ্চয়পত্র অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পেনশনারদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তার উৎস। কিন্তু আগামী জানুয়ারি থেকে সুদের হার আরও কমানোর ফলে তাদের জীবনযাত্রার খরচ এবং সঞ্চয় দুটোই ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৪১% কমেছে। এটি প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিনিয়োগের আগ্রহ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
সরকার এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমিয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ড এর মাধ্যমে ঋণ বাড়াচ্ছে। ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার সঞ্চয়পত্রের তুলনায় কম, ফলে সরকার আর্থিকভাবে লাভবান হলেও সঞ্চয়পত্রে নির্ভরশীল জনগণ—বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা—নির্ভরতা হারাচ্ছে।
সম্প্রতিইউরোপিয়ান জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি-তে গ্রিক অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্লেটসস ও আন্দ্রেয়াস সিন্টোসের গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার উদাহরণও টানা হয়েছে। সেখানে দেখায়, ১৯৮১-২০১৪ সালে আইএমএফ ঋণ গ্রহণকারী দেশগুলোতে বেকারত্ব বেড়েছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং শ্রমবাজার অনিশ্চিত হয়েছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, আইএমএফ ঋণ দেওয়ার আগে বাজেট ঘাটতি কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ, সরকারি ব্যয় সংকোচন ইত্যাতি শর্তের জালে আবদ্ধ করে। আর এসব বাস্তবায়ন করতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষ বেকারত্বের মুখে পড়েছে, আর সামাজিক সুরক্ষা ক্রমেই দুর্বল হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও একই ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। তদের শর্তগুলো দাদনদার বা এনজিও ঋণের মতোই। কৃষক বা জেলে অসহায় হয়ে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এই চক্র থেকে তারা এর মুক্ত হতে পারে না। আইএমএফের ক্ষেত্রে ফলাফল অনুরূপ।
তাহলে সমাধান কোথায়? তা হলো দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি করা, কৃষি ও শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা এবং সরকারি অপচয়ী ব্যয় কমিয়ে মূলধন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি কমবে, আইএমএফ ঋণের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা বজায় থাকবে।


