ঢাকাশনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. নিরাপদ খাদ্য
  3. লাইফস্টাইল

শৈশবের স্মৃতিতে কাঁঠাল, আজ জাতীয় ফল দিবস

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৫ বিকাল

Link Copied!

বিপ্লব হোসাইন: শৈশবের সেই তপ্ত দুপুরে উঠোনে পাটি পেতে বসার দিনগুলোর কথা কার না মনে পড়ে? গ্রীষ্মের ছুটি মানেই ছিল দাদুবাড়ি কিংবা নানাবাড়ির গাছের পাকা কাঁঠাল পাড়ার ধুম। চারদিকে মঁ মঁ করা মিষ্টি গন্ধ, হাতে আর গোঁফে শর্ষের তেল মেখে ভাইবোনদের সাথে কাঁঠাল খাওয়ার সেই প্রতিযোগিতা- বাঙালির নস্টালজিয়ার এক সোনালী অধ্যায়। কার ভাগে কয়টি কোয়া জুটল, কার বিচিটা সবচেয়ে বড়- এই নিয়ে চলত মিষ্টি খুনসুটি। শুধু খাওয়া নয়, খাওয়ার পর আঠা দিয়ে বন্ধুদের চুলে বিলি কেটে দেওয়া কিংবা কাগজে আঠা লাগানোর দুষ্টুমিগুলো আজও আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে অমলিন।

আজ ৪ জুলাই, কাঁঠাল দিবস। এই বিশেষ দিনে শৈশবের সেই মধুময় স্মৃতিকে সঙ্গী করেই বলতে হয়, কাঁঠাল কেবল আমাদের জাতীয় ফলই নয়, বরং এটি বাঙালির আবেগ, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং পরম ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুষ্টিগুণ, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং বহুমুখী ব্যবহারের দিক থেকে এই ফলের জুড়ি মেলা ভার।

বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ ২য় স্থানে অবস্থান করছে। এই তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। বৈশ্বিক বাজারে ভারতের পরেই বাংলাদেশের কাঁঠালের চাহিদা ও উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ ফলের বাজারের কথা চিন্তা করলে, আম ও কলার পর কাঁঠাল আমাদের দেশের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদিত ফল। দেশের মোট ফল উৎপাদনের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে এই জাতীয় ফল।

শৈশবের স্মৃতি ও বাঙালির কাঁঠাল উৎসব
বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে মধুমাসের ফল উৎসব, আর এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কাঁঠাল। ছোটবেলায় যৌথ পরিবারের সবাই মিলে একসাথে বসে কাঁঠাল ভাঙার আনন্দই ছিল আলাদা। কার ভাগে কয়টি কোয়া জুটল, কার বিচিটা সবচেয়ে বড়- এই নিয়ে চলত খুনসুটি। শুধু খাওয়া নয়, খাওয়ার পর আঠা দিয়ে বন্ধুদের চুলে বিলি কেটে দেওয়া কিংবা কাগজে আঠা লাগানোর দুষ্টুমিগুলো আজও আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে অমলিন। এই ফলটি কেবল আমাদের জাতীয় ফলই নয়, বরং প্রতিটি বাঙালির আবেগ ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক পরম অংশ।

উৎপত্তি ও ভৌগোলিক পরিচিতি
কাঁঠাল (বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus heterophyllus) মূলত মোরেসি পরিবারের একটি চিরহরিৎ বৃক্ষের ফল। ইতিহাসবিদদের মতে, কাঁঠালের আদি উৎপত্তিস্থল ভারতীয় উপমহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং বাংলাদেশ-ভারত সংলগ্ন বনাঞ্চল। পরবর্তীতে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, যেমন- থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ও ভারতের আসাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে এই ফলটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

কাঁঠালের বৈচিত্র্যময় প্রকারভেদ
খাওয়ার ধরন, স্বাদ এবং ভেতরের কোয়ার (Melon) গঠনের ওপর ভিত্তি করে কাঁঠালকে সাধারণত প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো ‘খাজা কাঁঠাল’, যা পাকার পরও বেশ শক্ত থাকে এবং কোয়াগুলো চিবিয়ে খেতে হয়। দ্বিতীয়টি ‘গালা বা রসালো কাঁঠাল’, যা পাকার পর অত্যন্ত নরম ও রসালো হয়ে যায়; চাপ দিলেই রস গড়িয়ে পড়ে। আর তৃতীয় জাতটি হলো ‘রসখাজা’, যা মূলত খাজা ও গালার একটি চমৎকার মিশ্রণ- কোয়াগুলো দেখতে খাজার মতো হলেও খেতে বেশ নরম ও মিষ্টি হয়। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও বারোমাসি কিছু জাতও এখন চাষ হচ্ছে।

পুষ্টির এক অনন্য ভাণ্ডার
কাঁঠালকে বলা হয় পুষ্টির পাওয়ার হাউজ। এতে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং ক্যালসিয়াম রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠাল থেকে প্রায় ৯৫ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এতে থাকা উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া এর পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। কাঁঠালে বিদ্যমান আঁশ বা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে।

‘গাছ-পাঁঠা’ ও মাংসের বিকল্প হিসেবে এঁচোড়
কাঁঠালের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কাঁচা ও পাকা— দুই অবস্থাতেই সমান জনপ্রিয়। কাঁচা কাঁঠালকে বলা হয় ‘এঁচোড়’। তরকারি হিসেবে এর স্বাদ ও টেক্সচারের কারণে একে অনেক সময় রসিকতা করে ‘গাছ-পাঁঠা’ বা নিরামিষাশীদের মাংস (Vegetarian Meat) বলা হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রক্রিয়াজাত করা কাঁচা কাঁঠাল মাংসের বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোতে বড় একটি বাজার তৈরি করেছে।

বিচির উপাদায়ত্ব ও অনন্য ব্যবহার
কাঁঠাল এমন একটি ফল যার প্রায় কিছুই ফেলা যায় না। কাঁঠালের ভেতরের কোয়া খাওয়ার পর যে বিচি বা বীজ পাওয়া যায়, তা পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। গ্রামীণ ও শহুরে উভয় সংস্কৃতিতেই কাঁঠালের বিচি ভর্তা, ডাল, কিংবা বিভিন্ন সবজি ও শুঁটকির তরকারিতে দিয়ে খাওয়া হয়। এমনকি কেবল আগুনে পুড়িয়ে বা ভেজেও এটি বাদামের মতো খাওয়া যায়, যা অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।

বহুমাত্রিক উপযোগিতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
ফলের বাইরেও কাঁঠাল গাছের প্রতিটি অংশের রয়েছে আলাদা অর্থনৈতিক মূল্য। কাঁঠালের খোসা এবং পাতা গবাদি পশুর (বিশেষ করে ছাগল ও গরুর) অত্যন্ত প্রিয় এবং পুষ্টিকর খাদ্য। অন্যদিকে, কাঁঠাল গাছ বড় হলে এর থেকে চমৎকার উজ্জ্বল হলুদ রঙের শক্ত কাঠ পাওয়া যায়। এই কাঠ অত্যন্ত টেকসই এবং উইপোকা প্রতিরোধী হওয়ায় ঘরের আসবাবপত্র, দরজা-জানালা এবং বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। মৌসুমি ফল হিসেবে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশাল অর্থের জোগান দেয়।

শৈশবের সেই দিনগুলো হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু কাঁঠালের স্বাদ ও এর গুরুত্ব আজও একই রকম রয়ে গেছে। তবে সঠিক সংরক্ষণ ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে প্রতি বছর দেশে প্রচুর কাঁঠাল নষ্ট হয়। আজকের এই কাঁঠাল দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, কাঁঠাল থেকে জ্যাম, জেলি, চিপস ও আচার তৈরির মতো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া হোক, যাতে এই জাতীয় ফলের গৌরব বিশ্বদরবারে আরও স্থায়ী রূপ পায়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

টিসিবির কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তর, সাশ্রয় হবে ৩০০-৩৫০ কোটি টাকা

দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে ভাসমান হাসপাতাল ‘স্বাস্থ্য তরী’ নির্মাণ করবে সরকার

চীনে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধার ঘোষণা

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য নাম ‘অর্নব’

‘সমন্বিত জলবায়ু পদক্ষেপ’ রক্ষা করতে পারে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ

২০২৬ সালের ১২ সিনেমায় ৭৫১ বার দেখানো হয় ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের দৃশ্য

রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি

চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে কুষ্টিয়ায় ফের বিএটিবি কর্মীদের মানববন্ধন

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে প্রযুক্তি ও জনবলে শক্তিশালী করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

হাওরে হাঁস চড়াতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু

টিসিবির কার্যক্রমে আসছে ডিজিটাল নজরদারি, বাদ ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী

আগামী মাসে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: রুশ রাষ্ট্রদূত