
গ্রামের কারিগরদের তৈরি শীতলপাটি, মৃৎশিল্প, তাঁত, কামার-কুমারের পণ্য ও রুপার গয়নাসহ বিভিন্ন পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, শুধু কারিগরদের আর্থিক সহায়তা দিলেই হবে না; পণ্যের মান বাড়াতে উন্নত কাঁচামাল, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা দিতে হবে। এতে প্রান্তিক মানুষের আয় বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বুধবার (১২ আগস্ট) ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স অন ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড এসডিজি’র সমাপনী দিনে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এসডিজি কোনো দাতব্য কর্মসূচি নয়। এর মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং নাগরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা। শুধু ভাতা বা নগদ সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব নয়। যার যেখানে সম্ভাবনা রয়েছে, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।
গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধরনের কাজ করে আসছেন উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, তাদের পণ্যের যথাযথ মূল্য তারা পাচ্ছেন না।
বরিশালের শীতলপাটি তৈরির কারিগরদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন কারিগর ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় একটি শীতলপাটি বিক্রি করেন। অথচ এতে যে পরিমাণ শ্রম ও হাতের কাজ রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এ ধরনের পণ্যের মূল্য আরও বেশি হওয়ার কথা।
এই পরিস্থিতি বদলাতে সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, শীতলপাটি, মৃৎশিল্প, তাঁত, কামার-কুমারের পণ্য ও রুপার গয়নার কারিগরদের উন্নত কাঁচামাল কেনার সুযোগ, নকশা সহায়তা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সুবিধা দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ভালো নকশা ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে ৭০০ টাকার একটি শীতলপাটি ২ হাজার টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হতে পারে। একইভাবে ১০ টাকার কোনো পণ্যকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে ৩০ টাকায় বিক্রির উপযোগী করা যেতে পারে। এতে কারিগরদের আয় বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে এবং তারা আরও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবেন।
গ্রামীণ পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আলিবাবা, আমাজন ও ইবের মতো আন্তর্জাতিক বিপণন প্ল্যাটফর্মে এসব পণ্য নেওয়ার উপযোগী করে তোলা হবে। দেশের বাজারের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের গ্রামীণ পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
এ ধরনের উদ্যোগকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে রূপ দিতে পারলে এর বাজার তৈরি হবে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগের উদাহরণ দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশটিতে গ্রাম পর্যায়ের মানুষকে দক্ষতা উন্নয়ন, কাঁচামাল, নকশা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পরে গ্রামের তৈরি পণ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়েছে। এতে পুরো গ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশেও এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার।
তবে এ কাজ সরকার একা করতে পারবে না বলেও জানান আমির খসরু। তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারিগরদের কাছে নকশা, কাঁচামাল, ঋণ ও বাজারসংযোগ পৌঁছে দেওয়া সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য বেসরকারি খাত ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে অংশীদার করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে যাদের কাজের অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ রয়েছে, তাদের কাজে লাগানো হবে।
সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায় শুধু গ্রামীণ কারিগর নয়, থিয়েটার, সংগীত ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, থিয়েটারের সঙ্গে শিল্পীর পাশাপাশি মেকআপ শিল্পী, আলোকসজ্জাকর্মীসহ অনেক মানুষ যুক্ত। এসব ক্ষেত্রকে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করা গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের এ উদ্যোগকে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। তারা যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবেন, সেই অর্থনীতির সুফলও তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। এসডিজির মূল দর্শনের সঙ্গেও এই ধারণার মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু বক্তৃতা, নীতি বা বাজেটে বরাদ্দ দিলেই হবে না; এসব উদ্যোগ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এ জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, এনজিও, নকশাবিদ ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ত্রুটি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সঠিকভাবে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে প্রান্তিক মানুষের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এসডিজি বাস্তবায়নের পাশাপাশি মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য বলেও জানান তিনি।