ঢাকাশনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

যে কারণে প্রতিদিন অজান্তেই প্লাস্টিক খাচ্ছেন আপনি

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২৬ সকাল

Link Copied!

৫ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট প্লাস্টিকের টুকরোকে বলা হয় ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’। এগুলো এতই ক্ষুদ্র যে অনেক সময় খালি চোখে দেখাও যায় না। একসময় প্লাস্টিক দূষণ বলতে আমরা নদী-নালা বা সমুদ্রে ভাসমান বোতল, পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্যকেই বুঝতাম। কিন্তু এখন বিজ্ঞান বলছে, প্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় হুমকি চোখে দেখা যায় না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। এমনকি মানুষের রক্ত, প্লাসেন্টা ও বুকের দুধেও মিলেছে এর উপস্থিতি। কীভাবে এই অদৃশ্য প্লাস্টিক আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে এবং এর ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ-সেই চিত্রই তুলে ধরা হলো।

আমরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যেসব প্রসাধন ও নিত্যব্যবহার্য জিনিস ব্যবহার করি, মূলত সেখান থেকেই প্লাস্টিক আমাদের শরীরে এবং পরিবেশে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের সুপরিচিত পরিবেশবাদী সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (ESDO)-এর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর তথ্য। তাদের মতে, আমাদের দেশের বাজারে থাকা অনেক নামীদামী ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশানো আছে, যার মধ্যে শিশুদের টুথপেস্টও রয়েছে। ত্বক পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত ফেসওয়াশ ও স্ক্রাবে ছোট ছোট দানার মতো যে ‘মাইক্রো-বিড’ থাকে, সেগুলোও আসলে প্লাস্টিক। মুখ ধোয়ার পর এগুলো ড্রেন দিয়ে সরাসরি পরিবেশে গিয়ে মেশে। এছাড়া আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহৃত ওয়েট টিস্যু এবং শিশুদের ডায়াপারের একটি বড় অংশ তৈরি হয় সিন্থেটিক বা প্লাস্টিকের ফাইবার দিয়ে, যা ব্যবহারের পর মারাত্মক দূষণ ছড়ায়।

আমাদের শরীরে প্লাস্টিক ঢোকার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো আমাদের প্রতিদিনের খাবার ও পানীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, প্লাস্টিকের বোতলের পানি এবং অনেক দেশের ট্যাপের পানিতেও প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কানাডার ‘ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি’-এর গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, আধুনিক যুগের প্লাস্টিক মিশ্রিত একটি টি-ব্যাগ গরম পানিতে ডোবালে কাপের চায়ের সাথে কোটি কোটি প্লাস্টিকের কণা মিশে যায়। সমুদ্র দূষণের কারণে সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া বা চিংড়ি এই প্লাস্টিকগুলো খেয়ে ফেলছে এবং সেই মাছের মাধ্যমে তা আমাদের প্লেটে ফিরে আসছে। এমনকি সমুদ্রের পানি শুকিয়ে তৈরি করা লবণের মধ্যেও বিজ্ঞানীরা প্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। আমাদের রান্নাঘরের পরিবেশও এর বাইরে নয়। বাসায় যে প্লাস্টিকের চপিং বোর্ডে সবজি কাটা হয়, ছুরির আঘাতে সেখান থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের গুঁড়ো খাবারে মেশে। আবার নন-স্টিক ফ্রাইপ্যানের কালো প্রলেপ বা টেফলন উঠে গেলে সেটিও আমাদের খাবারের সাথে মিশে শরীরে প্রবেশ করে।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা এখন মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের সন্ধান পেয়েছেন। ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের ‘ভ্রিজ ইউনিভার্সিটি’ (Vrije Universiteit Amsterdam)-এর বিজ্ঞানীদের এক যুগান্তকারী গবেষণায় প্রথমবারের মতো মানুষের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়। এর অর্থ হলো, রক্তনালীর ভেতর দিয়ে প্লাস্টিক এখন আমাদের সারা শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইতালির একদল গবেষক দেখিয়েছেন যে, মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় একটি শিশু যে প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের মাধ্যমে পুষ্টি পায়, সেখানেও প্লাস্টিক পৌঁছে গেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘পলিমারস’ (Polymers)-এ প্রকাশিত ইতালির বিজ্ঞানীদের আরেকটি গবেষণায় মায়ের বুকের দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, জন্মের পর প্রথম যে খাবারটি একটি শিশু গ্রহণ করছে, তার সাথেও তার শরীরে বিষাক্ত প্লাস্টিক ঢুকছে।

কেবল খাবার বা পানি নয়, নিশ্বাস নেওয়ার সময় বাতাস থেকেও আমরা প্লাস্টিক গ্রহণ করছি। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, রাস্তায় যখন তীব্র গতিতে গাড়ি চলে, তখন রাস্তার সাথে গাড়ির টায়ারের ঘর্ষণে টায়ার ক্ষয়ে গিয়ে সূক্ষ্ম রাবার এবং প্লাস্টিকের কালো গুঁড়ো বাতাসে ওড়ে। আমরা যখন শ্বাস নিই, তখন এই বিষাক্ত কণাগুলো আমাদের ফুসফুসে চলে যায়। এছাড়া আমরা যে পলিয়েস্টার বা নাইলনের তৈরি সিন্থেটিক কাপড় পরি, সেগুলো যখন ওয়াশিং মেশিনে ধোয়া হয়, তখন প্রতি ধোয়ায় সেখান থেকে লাখ লাখ প্লাস্টিকের সুতো বা ‘মাইক্রোফাইবার’ পানির সাথে মিশে সরাসরি নদী ও সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের এই নীরব মহামারী থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো প্লাস্টিকের ওপর আমাদের দৈনন্দিন নির্ভরতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা। একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হয় এমন প্লাস্টিক, যেমন- পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিকের কাপ-গ্লাস বা স্ট্র সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে। বাজার করার সময় পলিথিনের বদলে কাপড়ের বা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা এবং পানি পানের জন্য প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে কাঁচ বা স্টিলের বোতল ব্যবহার করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নিজেদের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি সুস্থ ও নিরাপদ পৃথিবীর জন্যই আমাদের এই সচেতনতাগুলো আজ থেকেই গড়ে তুলতে হবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

টিসিবির কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তর, সাশ্রয় হবে ৩০০-৩৫০ কোটি টাকা

দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে ভাসমান হাসপাতাল ‘স্বাস্থ্য তরী’ নির্মাণ করবে সরকার

চীনে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধার ঘোষণা

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য নাম ‘অর্নব’

‘সমন্বিত জলবায়ু পদক্ষেপ’ রক্ষা করতে পারে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ

২০২৬ সালের ১২ সিনেমায় ৭৫১ বার দেখানো হয় ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের দৃশ্য

রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি

চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে কুষ্টিয়ায় ফের বিএটিবি কর্মীদের মানববন্ধন

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে প্রযুক্তি ও জনবলে শক্তিশালী করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

হাওরে হাঁস চড়াতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু

টিসিবির কার্যক্রমে আসছে ডিজিটাল নজরদারি, বাদ ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী

আগামী মাসে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: রুশ রাষ্ট্রদূত