ঢাকামঙ্গলবার , ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

বিএনপির ‘২০ হাজার কিমি খাল খনন’ পরিকল্পনা নিয়ে রিভারাইন পিপলের মহাসচিবের মন্তব্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬ ৪:২৪ অপরাহ্ণ । ১৯৩ জন

বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন বা পুনঃখনন করবে-এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন ও বিতর্ক বেড়েই চলেছে। পরিকল্পনার বিস্তারিত নথিপত্র না থাকা, খননের ধরন ও পরিধি অস্পষ্ট হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিদ্যমান খাল ও নদীর পুনরুজ্জীবন দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেছেন, এমন বিপুল প্রকল্পের জন্য যথাযথ পরিকল্পনা, কারিগরি সক্ষমতা, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাব বিবেচনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা আবশ্যক।

রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। দলটির ওয়েবসাইটে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ বিষয়েও দশটি পরিকল্পনার মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নে ‘অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুর্নখনন’ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে বিস্তারিত নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। আমি বিএনপি সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে জিজ্ঞাস করেও সদুত্তর পাইনি।

ফলে, প্রশ্ন জাগে ২০ হাজার কিলোমিটার খনন করা হবে খাল না নদী? নাকি উভয়টি মিলে ২০ হাজার কিমি? নতুন করে খনন করা হবে, না বিদ্যমান খাল পুর্নখনন বা পুনরুদ্ধার করা হবে? পাঁচ বছরে বা ১৮২৫ দিনে ২০ হাজার কিলোমিটার হলে প্রতিদিন প্রায় ১১ কিলোমিটার খনন করা সম্ভব কিনা- এই প্রশ্ন যারা তুলছেন, তারা কূটতর্ক করছেন। এটা তো একটি টিম একটি মাত্র এলাকায় খনন করবে না। একাধিক টিম দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে খনন কাজ চালালে প্রতিদিন এর কয়েক গুণ এলাকা খনন সম্ভব। যাহোক, এসব বিষয়ে বিস্তারিত নথিপত্র পেলে যথাযথ মূল্যায়ণ সম্ভব হবে।

তার মতে, সন্দেহাতীতভাবেই বিদ্যমান ব্যবস্থায় দেশের ছোট-ছোট নদী ও খালগুলোর পুনরুজ্জীবনের বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা সহজ হবে। কৃষিসেচ, মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় নৌ চলাচল, এমনকি চিত্ত বিনোদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্ষাকালে পানির ধারন ক্ষমতা এবং এবং বছরভর ব্যবহারের সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, মনে রাখা জরুরি ১৯৭৭-৮১ সালের এবং এখনকার প্রতিবেশগত ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি এক নয়। যতদূর জানা যায়, তখন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে আড়াই শতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, তখন কেবলমাত্র গঙ্গায় ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়েছে। তিস্তা, গোমতী, মুহুরী, খোয়াই, সোমেশ্বরী, পিয়াইন, ডাহুক পভৃতি নদীর উজানে তখনও ভারতীয় ড্যাম বা ব্যরাজ ছিল না। ব্রহ্মপুত্রের উজানেও চীন ড্যাম বা ব্রহ্মপুত্রের উপনদীগুলোতে ভারতীয় ড্যাম ছিল না। ফলে, ঠিক সত্তর দশকের মতো পরিস্থিতি নেই। সেখানে সত্তর দশকের মাত্রায় ও পদ্ধতিতে খাল খনন কাজে নাও দিতে পারে; নতুন বাস্তবতায় নতুন করে ভাবতে হবে।

বর্তমানে খাল ও নদীগুলোর প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হলে উজানে নানাভাবে বিঘ্নিত বা আটকে থাকা প্রবাহের ব্যাপারে ভারত, চীন, নেপাল, ভুটানের সঙ্গে অববাহিকাভিত্তিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উজান থেকে পানির নিশ্চয়তা আদায় করতে না পারলে সারাবছর ধরে বিশেষত শুকনো মৌসুমে খালগুলো সচল রাখা কঠিন হবে; যদিও বর্ষাকালে সেই সমস্যা হবে না।

এই বিপুল কর্মযজ্ঞের কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। খননকৃত মাটি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবতে হবে। এজন্যও আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলেও নদী ও ক্ষেত্রবিশেষে খাল খননে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সাল থেকে ১৪ বছরে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার নৌপথ পুনরুদ্ধারের দাবি করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২০ সালে ১৭৮টি নদীতে আরও ১০ হাজার কিলোমিটার পুর্নখননের জন্য ‘ড্রেজিং মাস্টার প্ল্যান’ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সাফল্য স্পষ্ট নয় মূলত সুশাসনের অভাবে। অনেক নদী পুর্নখনন করতে গিয় একদিকে নদীর ঐতিহাসিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে খননকৃত মাটি ব্যবস্থাপনার অভাবে নদীর সঙ্গে জলাভূমি ও জমির সংযোগ বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রতিবেশগত ও জীববৈচিত্র্যগত ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া খননের নামে নদীর মাটি যেনতেনভাবে তুলে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। বিএনপি ঘোষিত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল বা নদী খনন বা পুর্নখননে এই চিত্রের যে পুনরাবৃত্তি হবে না, সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

শেখ রোকন, মহাসচিব, রিভারাইন পিপল