
সামুদ্রিক পাখি কী খাচ্ছে বা কীভাবে শিকার করছে, তার চেয়ে পাখির ‘বিবর্তনীয় বংশলতিকা’ দেখেই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে জানা যাবে তার পেটে প্লাস্টিক জমা হওয়ার ঝুঁকি কতটা। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘বায়োলজি লেটার্স’-এ গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, সামুদ্রিক পাখিরা যেসব খাবার বা প্লাস্টিক গিলে ফেলে, তা মূলত নির্ভর করে তাদের খাদ্যাভ্যাস ও শিকারের পদ্ধতির ওপর। তবে সম্প্রতিক এই বিশ্লেষণ বলছে, পাখির খাদ্যতালিকা বা জীবনযাত্রার চেয়ে তাদের পারিবারিক ও বংশগত বিবর্তনের সম্পর্কই প্লাস্টিক সঞ্চয়ের সবচেয়ে বড় নির্দেশক।
গবেষক দলটি ১৯৫৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ২৬২টি আন্তর্জাতিক গবেষণা সূত্র থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত একত্রিত করেন। এতে বিশ্বজুড়ে ২৪০টি প্রজাতির ৯৩ হাজার ২৮১টি সামুদ্রিক পাখির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, সংগৃহীত মোট প্রজাতির মধ্যে অন্তত ১৮২টি প্রজাতির পাখির পেটে কোনো না কোনো সময় প্লাস্টিকের উপস্থিতি ছিল। অর্থাৎ, বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রজাতিই প্লাস্টিক দূষণের শিকার।
গবেষণাকে আরো নির্ভুল করতে বিজ্ঞানীরা ২৩০টি প্রজাতির ৮২ হাজার ৪০৬টি পাখির সম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে একটি কম্পিউটার মডেল তৈরি করেন। সেখান থেকে বাসার ছানা পাখি ও অসম্পূর্ণ তথ্যের প্রজাতিগুলো বাদ দেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, পাখির দেহের আকার, খাদ্যাভ্যাস কিংবা উন্মুক্ত সমুদ্রে শিকারের অভ্যাসের চেয়ে বিবর্তনীয় সম্পর্কই প্লাস্টিক পুঞ্জীভূত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। সহজ কথায়, কাছাকাছি বিবর্তনীয় ধারার বা নিকটাত্মীয় প্রজাতিগুলোর প্লাস্টিক গিলে ফেলা ও জমা রাখার প্রবণতা প্রায় একই রকম।
গবেষকেরা ব্যাখ্যা করে জানান, প্লাস্টিক খাওয়া এবং তা পরিপাকতন্ত্রে আটকে রাখা দুটি ভিন্ন বিষয়। কিছু প্রজাতি হজম না হওয়া প্লাস্টিকজাতীয় বস্তু বমি করে উগরে ফেলে দেয়, কিন্তু কিছু প্রজাতির পাকস্থলীতে প্লাস্টিক দীর্ঘদিন জমে থাকে এবং খুব ধীরগতিতে শরীর থেকে বের হয়। এই আটকে রাখার শারীরিক ক্ষমতার পার্থক্যটিও পাখির বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
গবেষণায় কিছু সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়েছে। সমুদ্রে বা উপকূলে আটকে পড়া এবং জেলেদের জালে আটকে যাওয়া পাখিদের ওপর গবেষণাটি বেশি হওয়ায় এতে অসুস্থ পাখির সংখ্যা কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
তবে এর পরেও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যেসব প্রজাতির পাখিদের নিয়ে এখনো কোনো গবেষণা করা হয়নি, এই মডেল তাদের প্লাস্টিক গ্রহণের ঝুঁকি দ্রুত চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে। বর্তমানে বিশ্বে ১৪৩টি প্রজাতির সামুদ্রিক পাখির প্লাস্টিক গ্রহণের কোনো তথ্য রেকর্ড করা নেই; এই বংশলতিকা মডেলের মাধ্যমে সেগুলোকে আগেই চিহ্নিত করে জরুরি সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।