
বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা যত বাড়ছে, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও খাদ্যের কোল্ড চেইন রক্ষা করার জন্য শীতলীকরণের চাহিদাও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে একইসঙ্গে এসব এসি ও রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করার ফলে তৈরি হচ্ছে তীব্র জ্বালানি সংকট ও বিপুল গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন। এই দ্বিমুখী বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শীতলীকরণ প্রযুক্তি গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।
ইউএনডিপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে উৎপন্ন মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন কুলিং (এয়ার কন্ডিশনিং) প্রযুক্তিতে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এই শীতলীকরণের চাহিদা তিন গুণেরও বেশি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে দৈনন্দিন জীবনে খাবার ও ওষুধ সংরক্ষণ এবং বাসস্থানকে সহনীয় রাখতে এসি ও রেফ্রিজারেটর অপরিহার্য হলেও এর পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান পরিবেশগত ঝুঁকি। প্রথমত, অদক্ষ ও পুরনো কুলিং সিস্টেম চালু রাখতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসায় বায়ুমণ্ডলে বিপুল কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে। দ্বিতীয়ত, এসব যন্ত্রে ব্যবহৃত ক্ষতিকর হাইড্রোল্লুরোকার্বন গ্যাস ওজোন স্তরের ক্ষতি না করলেও এটি শক্তিশালী একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, যা বিশ্ব উষ্ণায়নকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ওজোন স্তর রক্ষায় ১৯৮৭ সালের ঐতিহাসিক মন্ট্রিল প্রোটোকল প্রবর্তনের পর বিশ্বজুড়ে ওজোন ক্ষয়কারী কেমিক্যালের ৯৮ শতাংশই নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। এরপর ২০১৬ সালে গৃহীত হয় ‘কিগালি সংশোধনী’, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষতিকর এইচএফসি গ্যাসের উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা।
চলতি বছরই এই ঐতিহাসিক কিগালি সংশোধনীর এক দশক (১০ বছর) পূর্ণ হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৭৪টি দেশ এই সংশোধনী আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে এবং ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী এইচএফসি ব্যবহার নির্ধারিত ভিত্তিমূল্যের চেয়ে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিগালি সংশোধনীর পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রায় ০.৩ থেকে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে।
১৯৯১ সাল থেকে বৈশ্বিক মন্ট্রিল প্রোটোকল বাস্তবায়নে বিশ্বের প্রায় ১২০টি দেশের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে আসছে ইউএনডিপি। সংস্থাটি কেবল আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং জাতীয় পর্যায়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নীতি প্রনয়ন, এসি ও রেফ্রিজারেশন খাতের কর্মীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কম-উষ্ণায়ন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা প্রদান করছে।
ইউএনডিপি জোর দিয়ে বলেছে, বর্তমান যুগে সমাধান কুলিং সুবিধার সরবরাহ কমানো নয়; বরং শক্তির অপচয় রোধ করে জলবায়ু-বান্ধব ‘স্মার্ট কুলিং’ নিশ্চিত করা। সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ওজোন স্তরের সুরক্ষার পাশাপাশি একটি টেকসই ও সবুজ পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।