ঢাকাসোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

নিজের প্রাণ বাঁচাতে ডিমকেই ঢাল করছে মৌমাছি, ঝুঁকিতে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
৮ জুলাই ২০২৬, ১:৫৬ বিকাল

Link Copied!

প্রকৃতির এক বিস্ময়কর ও অপরিহার্য পতঙ্গ হলো মৌমাছি। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য—দীর্ঘদিন কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকলে রানি মৌমাছি নিজের জীবন বাঁচাতে সেই বিষ নিজের শরীরে না রেখে তা স্থানান্তর করছে তার ডিমের মধ্যে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস-এর গবেষকদের এই উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিজ্ঞান ও কৃষি ব্যবস্থায় এক নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি ‘কারেন্ট বায়োলজি’ নামক বিশ্বখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস-এর এনভায়রনমেন্টাল টক্সিকোলজি বিভাগ। গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক সাশা নিকলিশ। সহযোগী গবেষক হিসেবে ছিলেন একই প্রতিষ্ঠানের পিএইচডি গ্রাজুয়েট অ্যাঞ্জেলা এনসেরাডো-ম্যানরিকেজ। এছাড়া লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের গবেষক দল— জুলিয়া ফাইন, এলিজা লিটসি, ডেভিড বালিউ-রদ্রিগেজ ও ব্রুস বুকহোলজ যৌথভাবে এই গবেষণায় কাজ করেছেন। মূলত মৌমাছির কলোনিতে কীটনাশকের প্রভাব কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংক্রামিত হচ্ছে, তা খুঁজে বের করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।

গবেষণার মূল বিষয়:
গবেষণায় রানি মৌমাছির এক অনন্য অথচ আত্মঘাতী আত্মরক্ষা পদ্ধতি উন্মোচিত হয়েছে, যাকে গবেষকরা নাম দিয়েছেন ‘ম্যাটারনাল অফলোডিং’। সাধারণত একটি মৌমাছি কলোনিতে শ্রমিক মৌমাছিরা বাইরের পরিবেশ থেকে সংগৃহীত খাদ্য ও পরাগ ছেঁকে নিয়ে রানি ও লার্ভাদের বিষমুক্ত খাবার নিশ্চিত করে। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে, শ্রমিকদের এই নিরবচ্ছিন্ন সুরক্ষায় রানি সম্পূর্ণ নিরাপদ।

কিন্তু নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, তখন শ্রমিক মৌমাছিদের ফিল্টার করার সক্ষমতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে। যখন এই সুরক্ষা বলয় আর কাজ করে না, তখন রানি মৌমাছি নিজেই বিষাক্ত রাসায়নিক গ্রহণের শিকার হয়। নিজের জীবন বাঁচাতে রানি তখন সেই বিষাক্ত ভার নিজের শরীর থেকে সরিয়ে ডিমের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়।

গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম ‘ন্যানোকলোনি’ তৈরি করে এই পরীক্ষার কার্যকারিতা যাচাই করেছেন। প্রতিটি কলোনিতে একটি রানি ও ৬০টি শ্রমিক মৌমাছি রাখা হয়েছিল। তাদের ‘মিথাইল প্যারাথিয়ন’ নামক একটি নির্দিষ্ট কীটনাশক মিশ্রিত খাবার দেওয়া হয়। বিষের গতিবিধি ট্র্যাক করার জন্য কীটনাশকটিতে একটি নিম্ন-স্তরের তেজস্ক্রিয় মার্কার যুক্ত করা হয়েছিল।

লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী ব্রুস বুকহোলজ জানিয়েছেন, তারা বায়োলজিক্যাল এক্সিলারেটর স্পেকট্রোমেট্রি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় মার্কারগুলোকে পারমাণবিক স্তরে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রথম দিন শ্রমিকরা ৯৫ শতাংশ কীটনাশক ফিল্টার করতে পারলেও ১০তম দিনে এই সক্ষমতা ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ, কলোনিতে বিষের জোগান শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

যা বলছেন গবেষকরা:
গবেষণার সিনিয়র লেখক সাশা নিকলিশ বলেন, ‘রানি মৌমাছি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো ডিমে চালান করে দেয়। মৌমাছির মধ্যে এই ধরনের আত্মরক্ষামূলক ও একইসঙ্গে ধ্বংসাত্মক আচরণের নজির আগে বিজ্ঞানীদের নজরে আসেনি।’

গবেষণার প্রধান লেখক অ্যাঞ্জেলা এনসেরাডো-ম্যানরিকেজ আরও স্পষ্টভাবে বলেন, ‘কীটনাশক ডিমে জমা হতে থাকলে ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এটি কলোনি ধ্বংসের পেছনে দীর্ঘমেয়াদী ও সুপ্ত কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। শ্রমিকদের সুরক্ষার একটা সীমা আছে, কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করলে রানি তখন শেষ অস্ত্র হিসেবে ডিমকে বেছে নেয়।’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব ও সংকট:
বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থায় ফসলের পোকা দমনে ব্যাপক হারে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার হয়। বিশেষ করে ধান, সবজি ও ফলের বাগানে ব্যবহৃত এই বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো সরাসরি আমাদের দেশীয় মৌমাছি কলোনিগুলোর ওপর পড়ছে। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মৌমাছির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাসের ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। গবেষণার এই ফলাফল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে কৃষি অর্থনীতির বড় অংশই মৌমাছির প্রাকৃতিক পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। যদি আমাদের দেশের রানি মৌমাছিরাও এভাবে বিষাক্ত ডিমে স্থানান্তর শুরু করে, তবে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই কলোনিগুলো ভেতর থেকে পচে নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে পরাগায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে এবং ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।

অদৃশ্য হুমকি ও কৃষকদের সচেতনতা:
বাংলাদেশে সাধারণত মৌমাছির তাৎক্ষণিক মৃত্যু নিয়েই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা কৃষকদের উদ্বেগ বেশি। কিন্তু এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছি কলোনিগুলো সুপ্ত বা ধীরগতির মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য বড় অঘোষিত ঝুঁকি। একজন কৃষক যখন বুঝতে পারেন না যে তার ব্যবহৃত কীটনাশক কীভাবে রানি মৌমাছির ডিমের মাধ্যমে কলোনিকে ধ্বংস করছে, তখন তিনি অসতর্কভাবেই নিজের ফসলের ক্ষতি করছেন। এই অদৃশ্য হুমকি রোধে কৃষকদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

সমাধান ও করণীয়:
গবেষকদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো ‘সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা’ বা ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যা করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে- রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে ফেরোমন ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক এবং প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমনের প্রযুক্তি জনপ্রিয় করা। মৌমাছি যখন পরাগায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে (সাধারণত দিনের বেলা ও ফুলের সময়), সেই সময়ে কীটনাশক প্রয়োগ থেকে কৃষকদের বিরত থাকতে হবে। মৌমাছি পালন এলাকা বা বনাঞ্চলের কাছাকাছি এলাকায় ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ আইন করে নিষিদ্ধ করা। এবং বাংলাদেশের নিজস্ব মৌমাছি প্রজাতিগুলোর ওপর কীটনাশকের কী প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর মাধ্যমে দেশীয় পর্যায়ে গবেষণা চালানো।

বিজ্ঞানীদের এই উদ্ভাবন এখন থেকে বিশ্ব কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌমাছি বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি, আর প্রকৃতি বাঁচলেই বজায় থাকবে খাদ্য নিরাপত্তা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

আগস্টের তিন ক্যাম্পেইনের বিজয়ীদের পুরস্কৃত করল উপায়

হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৯০৫

সাতক্ষীরায় বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিহত

ডিআর কঙ্গোতে ইবোলার সংক্রমণ ৭ হাজার ছাড়াল, মৃত্যু ৩৩৯৮

চুয়াডাঙ্গায় দ্রুতগতির পিকআপভ্যানের ধাক্কায় বৃদ্ধা নিহত

ময়মনসিংহে ট্রাকচাপায় অন্তঃসত্ত্বা নারী নিহত

খুলনা-ঢাকা মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় সাংবাদিক নিহত

আগামী পাঁচ দিনজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস

ইন্দোনেশিয়ায় ২৪৩ যাত্রী-ক্রু বহনকারী ফেরির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

উদ্বোধনী দিনে কৃষক কার্ডের প্রণোদনা পাবেন ১ লাখ ১০ হাজার কৃষক

রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের আশা

সকল জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা চালু করবে সরকার