
বাংলাদেশে মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে মানুষের অবহেলা থাকলেও এই রোগে প্রবীণদের মৃত্যুর ঝুঁকি মারাত্মক বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ দুই দশকের গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছেন, দেশে বর্ষা শুরুর আগে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বহুগুণ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় রোগ নিয়ন্ত্রণ ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ, শিশু ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্তদের জন্য বার্ষিক টিকাদান নিশ্চিত করা এবং দেশব্যাপী শক্তিশালী ইনফ্লুয়েঞ্জা নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করার বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মহাখালীতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) মিলনায়তনে ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভিল্যান্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জাতীয় প্রচার সেমিনারে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। আইইডিসিআর এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সরকারের নীতি নির্ধারক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, গবেষক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সেমিনারে আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোনালিসা এবং আইসিডিডিআর,বি-এর সহযোগী বিজ্ঞানী ও প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. ফাহমিদা চৌধুরী প্রায় ২০ বছরের (মে ২০০৭ থেকে জুলাই ২০২৬) নজরদারির বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-কাশির রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২২ হাজার ২৮৪ জন অর্থাৎ মোট নমুনার প্রায় ১৩ শতাংশের শরীরে ল্যাবরেটরি-পরীক্ষিত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি—প্রায় ২৩ শতাংশ। এর পরেই ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার ২২ শতাংশ। তবে ভাইরাসে আক্রান্তের হার তরুণ ও শিশুদের মধ্যে বেশি হলেও এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে প্রবীণদের। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
গবেষণায় বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক ধরণ ‘সিজনালিটি’ উঠে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদী উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতি বছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে জুন ও জুলাই মাসে। এমনকি ২০২৬ সালের তথ্যেও একই চিত্র মিলেছে; যেখানে জানুয়ারি মাসে আক্রান্তের হার ছিল ৩.০২ শতাংশ, তা এপ্রিলে লাফিয়ে ২৬.০৬ শতাংশে পৌঁছায়। দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসা প্রতি চারজন রোগীর মধ্যে একজন ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত, যা বছরের বাকি সময়ে থাকে মাত্র ২৫ জনের মধ্যে একজন।
তথ্য বিশ্লেষণ করে ডা. ফাহমিদা চৌধুরী প্রতিরোধক টিকাদানের সঠিক সময় নির্ধারণের ওপর জোর দেন। তিনি জানান, দেশে এপ্রিল মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই—অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসকে বার্ষিক টিকাদানের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এতে করে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ার আগেই শরীরে কার্যকর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ, গর্ভবতী নারী, কিডনি ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সাধারণত সর্দি-কাশি হিসেবে ইনফ্লুয়েঞ্জাকে সহজভাবে দেখা হলেও এর অর্থনৈতিক ও শারীরিক প্রভাব অনেক গভীর। ইতিপূর্বে ২০১৯ সালের এক জাতীয় প্রাক্কলনে দেখা গিয়েছিল, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি হন। আর ২০১১-২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৬ হাজার ৮০৪ জন মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা সম্পর্কিত নানা জটিলতায় মারা যান।
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা প্রায়ই ইনফ্লুয়েঞ্জাকে খুব হালকাভাবে নিই, অথচ এর ক্ষতিকর বিস্তার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বড়। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পর বিশেষ করে প্রবীণ ও জটিল রোগীদের যথাযথ ফলোআপ নিশ্চিত করা জরুরি।’
এদিকে, আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসেন হাবিব মৌসুমি সর্দি-কাশির চিকিৎসায় অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত রোগ। অথচ এই মৌসুমে গণহারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বাড়িয়ে তুলছে। তিনি চিকিৎসকদের সতর্কতার সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-এর অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, কেবল গবেষণা বা নজরদারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, প্রাপ্ত তথ্যকে দ্রুত সরকারি নীতি ও জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে হবে।
সেমিনারে অন্য বক্তারা মানব স্বাস্থ্য, প্রাণী স্বাস্থ্য ও পরিবেশের সমন্বয়ে ‘ওয়ান হেলথ’ মডেল বাস্তবায়ন এবং বার্ড ফ্লুসহ নতুন যেকোনো উদীয়মান শ্বাসকষ্টজনিত ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বছরজুড়ে তদারকি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।