ঢাকারবিবার , ২৩ নভেম্বর ২০২৫
  • অন্যান্য

আজকের সর্বশেষ সবখবর

ডব্লিউএইচও তামাক চুক্তিতে ঐতিহাসিক অগ্রগতি:

জেনেভার কপ১১ বিশ্বকে ‘তামাক এন্ডগেম’- এর আরও কাছে নিয়ে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ২৩, ২০২৫ ১:০২ অপরাহ্ণ । ১৬৪ জন

বিশ্বব্যাপী তামাক মহামারি নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোবাকো কন্ট্রোল (ডব্লিউএইচও এফসিটিসি)- এর ১১তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ কপ১১-এ। ১৭ থেকে ২২ নভেম্বর জেনেভায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অংশ নেয় বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য সংগঠনগুলো। এদের অন্যতম ছিল মার্কিনভিত্তিক অগ্রণী তামাকবিরোধী সংগঠন অ্যাকশন অন স্মোকিং অ্যান্ড হেলথ (এএসএইচ), যারা এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে একটি প্রভাবশালী প্রতিনিধিদল নিয়ে অংশগ্রহণ করে।

কপ১১-এ গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতের তামাক নিয়ন্ত্রণের দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করছেন। বৈঠকে এমন সব নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে, যা শুধু ধূমপান কমানো নয়, বরং তামাক সরবরাহ কমিয়ে একসময় সম্পূর্ণ নির্মূল করার কৌশল বাস্তবায়নের পথও খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে তামাক শিল্পের পরিবেশগত ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর তাদের অপরাধমূলক প্রভাবের জন্য তাদের আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

এএসএইচ- এর নেতৃত্বে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদলটি কপ১১-এ কয়েকটি কৌশলগত বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে ছিল এফসিটিসি- এর ধারা ২.১- এর অধীনে ভবিষ্যতমুখী তামাক নিয়ন্ত্রণ বা তথাকথিত ‘তামাক এন্ডগেম’ কৌশলকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা, ধারা ১৮- এর মাধ্যমে তামাক ও নিকোটিন পণ্যের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী পদক্ষেপে দেশগুলোকে উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘদিন প্রায় অকার্যকর থাকা ধারা ১৯- এর অধীনে তামাক শিল্পের বিরুদ্ধে দেওয়ানি, ফৌজদারি, প্রশাসনিক, মানবাধিকার ও পরিবেশগত আইনি ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়নের সুযোগগুলো সামনে আনা।

এএসএইচ-এর নির্বাহী পরিচালক লরেন্ট হিউবার কপ১১- এর ফলাফলকে “বিশ্বকে তামাক মহামারি শেষ করার আরও এক ধাপ কাছে নিয়ে যাওয়া” বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে; আর কপ১১ দেশগুলোকে সেই বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন মানদণ্ড ও নির্দেশনা দিয়েছে। তার এই বক্তব্য বৈঠকের মূল বার্তাকে প্রতিফলিত করে- আইন ও নীতি প্রণয়ন শেষ কথা নয়, বরং তা কিভাবে স্থানীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটাই মূল চ্যালেঞ্জ।

এএসএইচ-এর প্রতিনিধিদলে ছিলেন ক্রিস বস্টিক, কেলসি রোমিও-স্ট্যাপি, মেগান ম্যানিং এবং বোর্ড সদস্য ড. ক্যারোলিন ড্রেসলার। আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অঙ্গনের সুপরিচিত বিশেষজ্ঞরা- মাইকাহ বারম্যান, ডেনিস চয়েনিয়েরে, মারিটা হেফলার, কার্ট রিবসল এবং লুসিয়ানো রুগিয়াও- এএসএইচ-এর সাথে যুক্ত হয়ে কপ১১-এ আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেন। তাদের অনেকেই এএসএইচ- এর কাজকে শুধু কার্যকর নয়, বরং বৈশ্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণ অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য বলে মূল্যায়ন করেছেন।

অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, এএসএইচ- এর তৃণমূল অভিজ্ঞতা, আইনি জ্ঞান, নীতি–অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক একত্রে এমন এক শক্তি তৈরি করেছে, যা এফসিটিসি-এর বিভিন্ন অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে দেশগুলোর জন্য বাস্তব সহায়তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে ধারা ২.১-এর অধীনে “ফরওয়ার্ড লুকিং মেজারস” বা ভবিষ্যতমুখী উদ্যোগের ওপর যে বিশেষজ্ঞ দলের রিপোর্ট কপ১১-এ সামনে এসেছে, তা তামাক-মুক্ত বিশ্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণে দেশগুলোকে স্পষ্ট রূপরেখা দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।

এছাড়া ধারা ১৯–এর বাস্তবায়নে নতুন করে মনোযোগ আসাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কারণ, এত দিন তামাক শিল্পের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে অনেক দেশই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, কিংবা পর্যাপ্ত সহায়তা ও দিকনির্দেশনা পায়নি। কপ১১- এ বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশগুলোকে স্পষ্টভাবে উৎসাহিত করেছে যেন তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ব্যবহার করে তামাক কোম্পানিগুলোকে মৃত্যুর দায়, পরিবেশ ধ্বংস, এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।

জেনেভায় কপ১১ আয়োজনের মধ্যেও এক ধরনের প্রতীকী বিদ্রূপ রয়েছে। সুইজারল্যান্ড এখনো এফসিটিসি-তে স্বাক্ষরকারী হলেও চুক্তিটি অনুমোদন করেনি, অথচ দেশটিতে চলছে বিশ্বের একাধিক বৃহৎ তামাক কোম্পানির সদর দফতর। কম কর এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির সুবিধা নিয়ে এখান থেকেই তারা “হাম রিডাকশন” বা ‘কম ক্ষতিকর’ পণ্যের আড়ালে নিজেদের মূল লক্ষ্য- অতিরিক্ত মুনাফা-অবিরত তাড়া করে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে লুসিয়ানো রুগিয়া সহ বহু বিশেষজ্ঞই মনে করেন, জেনেভায় কপ১১-এ এএসএইচ- এর মতো সংগঠনের জোরালো উপস্থিতি তামাক শিল্পের প্রভাব মোকাবিলায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী।

কপ১১-এ অংশ নেওয়া দেশগুলোর জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা। বহু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ এখনও তামাক কর, প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন, নজরদারি এবং আইন প্রয়োগে পর্যাপ্ত অর্থের ঘাটতিতে ভুগছে। কপ১১ তাদেরকে এমন সব কৌশল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ দেখিয়েছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য- সংক্রান্ত এ কার্যক্রমগুলোকে টেকসই করা সম্ভব হতে পারে।

এফসিটিসি-এর কপ দেশগুলো বিগত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী ধূমপানমুক্ত জনস্থান, তামাক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ, সাধারণ প্যাকেজিং, এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তামাক শিল্পকে প্রভাবমুক্ত রাখা—এসব মাইলফলক অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কপ১১ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ, তবে এবার আরো স্পষ্টভাবে “তামাক–মুক্ত ভবিষ্যৎ”–কে লক্ষ্য হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে।

এএসএইচ জানিয়েছে, তারা কপ১১-এ গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। সংগঠনটি মনে করে, বৈশ্বিক তামাক মহামারি এমন এক সমস্যা, যার সমাধানে শুধু আংশিক কমানো নয়, একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য ছাড়া বিকল্প নেই। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এএসএইচ যে ‘শূন্য তামাক মৃত্যু’-র স্বপ্ন দেখে আসছে, কপ১১- এর ফলাফল সেই স্বপ্নকে বাস্তবের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।