ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. মতামত

জীবন্ত সত্তা নদীর অভিভাবকহীনতা

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৪ মার্চ ২০২৪, ৩:১৫ সকাল

Link Copied!

আজ আন্তর্জাতিক নদী কৃত্য দিবস। যাকে আরেকভাবে বলা হয়, আন্তর্জাতিক নদী রক্ষায় করণীয় দিবস। নদ-নদীর গুরুত্ব ও সংরক্ষণে কর্তব্য উপলব্ধি থেকেই ১৯৯৮ সাল থেকে সারা বিশ্বে ১৪ মার্চ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। সবুজ-শ্যামল সজল প্রকৃতি প্রাণের বৈচিত্র্য মানেই বাংলাদেশ। এই প্রাকৃতিক বৈচিত্রের প্রাণশক্তিই হলো দেশের ৭ হাজার নদ-নদী জলাভূমি। সেই সাথে আমাদের এসব নদীর সাথে জড়িয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য, জীবন জীবিকা, জীব বৈচিত্র্য।

আজ সচেতনতা ও সংরক্ষণের অভাবে নদীর ধার ঘেঁষে গড়া প্রাচীন নগরীর ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলে গেছি। নদীকে ঘিরে মাঝি-মাল্লা, জুগী, জেলেসহ অজস্র জনগোষ্ঠী জীবিকা হারিয়েছে। ভরাট, দখল দূষণে অজস্র প্রাণীর বিতাড়ন ও বিলুপ্তিতে জীববৈচিত্র্যও আজ সম্পূর্ন ধ্বংসের মুখে।

এই নদীই একটি জীবন্ত সত্তা। ২০১৯ সালে, ৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের দেশের মহামান্য হাইকোর্ট একটি রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা (লিভিং এনটিটি)’ বলে আদেশ জারি করেছে। এর অর্থ মানুষের মতো নদীরও সুস্থ সুন্দর থাকার অধিকার রয়েছে। দখল দূষণ ভরাটের সাথে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে রয়েছে আইনি অধিকার। এর আগে বিশ্বব্যাপী এ ধারণার সূচনা হয়েছে কলম্বিয়া থেকে ২০১৭ সালে। সোনা আর কয়লার খনির কারণে নদী ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় দেশটির সাংবিধানিক আদালত ‘রিয়ো এট্রাটো’ নামক একটি নদীকে এ অধিকার দেয়। এ পরিস্থিতি থেকে নদীটিকে রক্ষার জন্যই আদালত একে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে।

নিউজিল্যান্ডের একটি নদীকে খুবই পবিত্র মনে করে এবং সেটিকেও জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজ্য আদালত থেকে নর্মদা নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা দেয়া হয়েছে কারণ নদীটি খাওয়ার পানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নদী একটি জীবন্ত সত্তা বটে। প্রকৃতিতে প্রাণের সৃষ্টি যে জলজ পরিবেশে তা অনেকেরই অজানা নয়। যেখানে পানি নেই, সেখানে প্রাণের সৃষ্টিও নেই। অজস্র অনুজীব, শ্যাওলা, শামুক-ঝিনুক, সাপ, ব্যাঙ, মাছসহ, আগাছা ছোট-বড় বৃক্ষ-লতাসহ সব প্রাণের সৃষ্টি, বিকাশ, বিবর্তন, বৃদ্ধি এবং বিস্তৃতি জলাধারের প্রতিবেশকে ঘিরে। বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙ্গা, রাতচোরা, শিশুক উদবিড়ালসহ হাজারও প্রাণের সমাহার। আবার মাঝি-মাল্লার পরিবহন, পারাপার যোগাযোগ; জেলেদের মাছ ধরা; জুগিদের শামুক ঝিনুক হতে চুন তৈরি ঘিরে ঐতিহ্যবাহী পেশা; চাষিদের ফসল উৎপাদনসহ অসংখ্য জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষভাবে জীবন-জীবিকা এবং কৃষি-কৃষ্টি সাহিত্য-সংস্কৃতি সবই এই পরিমন্ডলের দ্বারা প্রভাবিত ও প্রচলিত। আবার আবহাওয়া ও জলবায়ু বৃষ্টি বাদল খরা সবই, নদী-নালার পানি প্রবাহ দ্বারাই হাজার হাজার বছর ধরে নিয়ন্ত্রিত। এক কথায় জলজ প্রতিবেশ তথা নদী হলো এ দেশের প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশ ও আমাদের জীবন সংস্কৃতির প্রধান অনুসঙ্গ।

রাষ্ট্রের যে পরিবেশ অধিদপ্তরের জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন রয়েছে তারা গত বছর জরিপের মাধ্যমে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ও তালিকা প্রকাশে উদ্যোগ নেয়। গত ২০২৩ সালে ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবসে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাংলাদেশের নদ-নদী: সংজ্ঞা ও সংখ্যা শীর্ষক একটি বই প্রকাশ করেছে। সেই প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে-নদীর সংখ্যা, সংজ্ঞা, দৈর্ঘ্য, উৎস-পতনের মুখ, নদীর দৈর্ঘ্যসহ সবকিছু নিয়ে বেশকিছু অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগ তুলেছে নদী গবেষকসহ বিভিন্ন মহল থেকে।

এর আগে ৯ আগস্ট,২০২৩ তারিখে দেশের সব নদ-নদীর একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছিল নদী রক্ষা কমিশন। ওই তালিকায় নদ-নদীর সংখ্যা ছিল ৯০৭টি। তালিকার ওপর মতামত ও আপত্তি আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয় কমিশন। আমি সাড়া দিয়ে আমাদের হোসেন নগর গ্রামের (জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার অর্ন্তগত) পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নন্দাহার নদী (উৎস ও পতন স্থল দৈর্ঘ উল্লেখ করে) তালিকায় সংযুক্ত করার অনুরোধ জানাই। এর প্রেক্ষিতে কমিশন কতৃর্ক এখানের জেলা প্রশাসনকে ও আমায় (অনুলিপি) পত্র ইস্যু করে। জেলা উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরকে পুনরায় তথ্য উপাত্ত প্রদান করি এবং আবারও মেইল করি। উল্লেখ্য সেই নন্দাহার নদী পথে মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ-র (শাসনকাল ১৪৯৩-১৫১৯) এই অঞ্চলের আগমের ইতিহাস। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় সেই নদী স্থান পায়নি। কেন পায়নি তার ব্যাখ্যা জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি কমিশন।

তড়িঘড়ি করে ভুলে ভরা তালিকা প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। নদী ও প্রকৃতি গবেষক- মাহবুব সিদ্দিকী ১৫ নভেম্বর, ২০২৩ তারিখে দৈনিক বণিক বার্তায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন- আমার অনুসন্ধান অনুযায়ী দেশে নদ-নদীর সংখ্যা আমরা ১ হাজার ৯০৮টি পেয়েছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি জেলা আছে। এ জেলাগুলোর নদীর সংখ্যা নিয়ে এখনো সঠিকভাবে জরিপ হয়নি। এ তিন জেলার নদীর তালিকা পেলে নদ-নদীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এগুলোর সবই অস্তিত্ব বিদ্যমান।

লেখকের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নন্দাহার নদী

এখন প্রশ্ন হলো- কেন এতো আপত্তি? কেনই বা এতো অসামঞ্জস্য? তালিকায় আমাদের সেই নদী অন্তর্ভুক্তিকরনে অভিযোগ করতে গিয়ে বেশকিছু অসঙ্গতি মনে হয়েছে। জেলা প্রশানের নির্দেশের প্রেক্ষিতে কালেক্টরেট অফিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা নির্বাহী অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কার্যালয় সমূহ তথ্য যাচাইএ আমার সাথে বিছিন্ন ভাবে ফোনে যোগাযোগ করে। তাতে মোটাদাগে যেটা মনে হয়েছে- জেলা উপজেলার সংশ্লিষ্ট অফিস সমূহের মধ্যে ছিলনা কোন সমন্বয়। তাদের উচিৎ ছিল সংশ্লিষ্ট অফিস সমূহসহ পরিবেশ প্রকৃতি নদী বিষয়ে গবেষণা, সচেতনতামূলক কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ, সংগঠন সমন্বয়ে একাধিক সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া। যা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে অভিহিত করে চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নে সহায়তা করা। কিন্তু অপরদিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ৭ সেপ্টেম্বর ইস্যু করা চিঠি ডাকে প্রেরণ করে হতে পৌঁছেছিল ১১ তারিখ আর ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখের মধ্যে তথ্য চাওয়া হয়েছে। ৭ দিনেরও কম বেঁধে দেয়া সময়ে তড়িঘড়ি করে উক্ত সমন্বয় সাধন সম্ভব নয়। ফলে অনেক ভুল-ভ্রান্তি ও অসংগতি রয়ে গেছে। এটি কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়। তাদের তালিকায় ১ হাজার ৮টি নদ-নদীর তালিকা দেয়া আছে। তার মধ্যে ৫৮১টি নদীর উৎসমুখ-পতিতমুখ-মোহনার উল্লেখ নেই। আবার তালিকায় অনেক নদী অর্ন্তভুক্ত না করার অর্থ হলো- নদীকে অনাথ তথা অভিভাবকহীন করা। এতে দখল দূষণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া কঠিন হবে। এতো অসংগতি ফলে নদীর অভিভাবক হিসেবে উক্ত কমিশন যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়োজিত, তা অবহেলাই প্রতিয়মান হয়। নদীর গুরুত্ব তাদের বোধের বাইরে কিনা প্রশ্ন এসে যায়।

পৃথিবীর ছয় প্রকারের ইকোসিস্টেমস বা বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণ বৈচিত্রময় বাস্তু সংস্থানতন্ত্র বলা হয় নদী বা মিঠা পানির উৎসকে। কৃষি ও পানীয় জলের নিশ্চয়তা এবং উর্বরা ভূমির কারণে পৃথিবীর আদি সভ্যতাগুলোও নদী তীরেই গড়ে ওঠে। কোনো নদীর টিকে থাকার উপর নির্ভর করছে কোন সভ্যতা জীববৈচিত্রের অস্তিত্ব। বছর ২৫-৩০ পূর্বেও নদী নালায় কতশত প্রকারের মাছ পাওয়া যেতো। ছিল অজস্র অনুজীব, শ্যাওলা, শামুক-ঝিনুক, পাখপাখালি, সাপ, ব্যাঙসহ, তীর জুড়ে বৈচিত্র্যময় আগাছা, ছোট-বড় গাছগাছালি। আজ চোখ বন্ধ করে ভাবলেই দেখা যাবে গত দুই দশকেই অসংখ্য প্রজাতির মাছ, শামুক ঝিনুক, অনুজীব বিলুপ্ত হবে গেছে।

আন্তর্জাতিক এক বেসরকারী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত প্রজাতির মধ্যে উভচর প্রাণীরা সর্বোচ্চ (৪১%)হুমকির মধ্যে রয়েছে। এভাবে নদনদী দখল দূষণে অজস্র জীবন ও জীবীকা বিপন্ন, বিধ্বস্ত চলতে চলতে ভবিষ্যতে মানুষজাতিকেও একদিন বিলুপ্তির বিষাদে তলিয়ে যেতে হবে। তাই দেশের নদনদী যথাযথ তালিকা প্রণয়ন ও তা গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করে নদীর আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংরক্ষণ, উন্নয়নে জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকেই প্রকৃত দায়িত্বশীল অভিভাবকের ভূমিকা পালন করত হবে এবং সেই সাথে সচেতন ব্যক্তি, সমাজ, সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে।

রতন মণ্ডল : কৃষিবিদ, কলাম লেখক ও ‘দেশীগাছ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আন্দোলন’ এর উদ্যোক্তা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Front-of-Package Labelling to Warn About Ultra-Processed Food Risks

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করবে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং

কানাডার সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

লঘুচাপের প্রভাবে সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি, এরপর আরও বাড়বে বর্ষণ

বারবার পেটের সমস্যা? হতে পারে আইবিএসের লক্ষণ

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচন

vivo Y500 Goes on Sale with Exclusive Offers

আকর্ষণীয় অফারের সাথে যাত্রা শুরু করলো ভিভো ওয়াই৫০০

MetLife Bangladesh recognizes best insurance employees in financial inclusion and customer service

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবায় সেরা বীমা কর্মীদের স্বীকৃতি দিল মেটলাইফ বাংলাদেশ

ঢাকায় আজ বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা, সামান্য বাড়তে পারে তাপমাত্রা