
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মানুষ বা পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রাণীকুলের ওপরও পড়ছে মারাত্মকভাবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা গ্রীষ্মমন্ডলীয় পাখিদের অস্তিত্বকে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে। বন উজাড় বা শিকারের মতো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াও শুধু অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পাখির সংখ্যা ২৫ থেকে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হ্রাস অনেক সময় বন ধ্বংসের প্রভাবের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ, চরম তাপমাত্রা গ্রীষ্মমন্ডলীয় পাখিদের জন্য এক নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী সংকট তৈরি করছে।
বার্সেলোনা সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের গবেষক ম্যাক্সিমিলিয়ান কোটজ বলেন, “এটি এক আশ্চর্যজনক হ্রাস। পাখিরা বিশেষ করে পানিশূন্যতা ও তাপচাপের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতিরিক্ত তাপ মৃত্যুহার বাড়ায়, উর্বরতা কমায়, প্রজনন আচরণে পরিবর্তন আনে এবং বংশবৃদ্ধির হার হ্রাস করে।”
গবেষকরা কয়েক দশকের পাখি সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করে উন্নত গণনামূলক মডেল ব্যবহার করেছেন, যাতে সেসব অঞ্চলকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেখানে পর্যবেক্ষণ সীমিত। তাদের মতে, চরম তাপ এমনকি অক্ষত রেইনফরেস্টেও রহস্যময় পাখি হ্রাসের ব্যাখ্যা দিতে পারে, যেখানে বন উজাড় বা শিকারের কোনো প্রভাব নেই।
“ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা প্রজাতিগুলোকে তাদের প্রাকৃতিক অভিযোজন সীমার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে-এবং তা ঘটছে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই,” কোটজ সতর্ক করে বলেন। “অবশেষে আমাদের নির্গমনই এই সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু।”
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ পাখি প্রজাতি যাদের সংবার্ড বলা হয়, তারা চরম তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। যদিও গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে এই ফলাফল নির্দিষ্ট কোনো প্রজাতির ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে অন্যান্য গবেষণাও একই ধরনের নাটকীয় পতনের প্রমাণ দিয়েছে।
ইকুয়েডরের আমাজনে ২২ বছরের দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, বন উজাড়, কীটনাশক ব্যবহার বা শিকার না থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি পাখির প্রজাতির সংখ্যা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। গবেষক জন ব্লেক জানান, “ভোরের কোরাস নামে একটি বিষয় রয়েছে, যেখানে ভোরের আগে শত শত পাখি গান গায়। কিন্তু গত দশ বছরে সেই সুর ক্রমশ নীরব হয়ে আসছে।”
এমনই এক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে পানামার একটি সংরক্ষিত বনে। ১৯৭৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গ্রীষ্মমন্ডলীয় রাজকীয় ফ্লাইক্যাচারের সংখ্যা ৯৫ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে আমাজনের কালো গলাযুক্ত ট্রোগন ও লাল-ক্যাপড মানাকিন প্রজাতির সংখ্যা ৬০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
চল্লিশ বছর আগে গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে বছরে গড়ে মাত্র তিন দিন তীব্র তাপ দেখা যেত। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দিনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ল্যাব অফ অরনিথোলজির গবেষক কনর ট্যাফ এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা প্রায়শই গড় তাপমাত্রা ও নগরায়ন, দূষণের মতো সামগ্রিক মানবিক প্রভাবের কথা ভাবি, কিন্তু কয়েক দিনের চরম তাপও বন্য প্রাণীর জন্য মারাত্মক হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “দুর্ভাগ্যবশত, চরম তাপমাত্রার সংস্পর্শ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে থাকবে। ভূমি ব্যবহার বা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার মতো সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে এটি সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।”