মৃত্তিকা খোরাকি দিয়ে বাঁধে বৃক্ষটারে, আকাশ আলোক দিয়ে মুক্ত রাখে তারে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
মাটি হলো প্রকৃতির অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। জীবের জন্ম, বাস, বিচরণ ও বিকাশ-বৃদ্ধি মাটিকে ঘিরে। সকল অর্থনীতির উৎসই মাটি। এই মাটি বলতে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের জলবায়ুকৃত খনিজ উপাদান, জৈব উপাদান, জল এবং বায়ু সহযোগে নরম অংশকে বুঝি। মাটির গুণের শেষ নেই। মাটির গুণেই শাক-সব্জি, ফলমূলের স্বাদের তারতম্য ঘটে। দুআঁশ মাটির মিষ্টিকুমড়া বেলে মাটির চেয়ে সুস্বাদু। আবার লাল-মাটির খেজুরগাছের রস মিষ্টির বেশি তা কারো অজানা নয়। মাটির গুণাগুণে অঞ্চলভিত্তিক ফল-মূলের স্বাদে ভিন্নতা হয় তা সবারই জানা। রাজশাহী বা চাপাঁই নবাবগঞ্জের আম, মধুপুর বা সিলেটের আনারস আনারস মিষ্টি স্বাদে অনন্য। মাটিতেই বৃক্ষের ক্ষুদ্র বীজ হতে পানি-পুষ্টি ও সূর্য্যরে আলো শোষণ করে বিশাল আকৃতির বৃক্ষ গড়ে ওঠে। বেড়ে ওঠতে মানুষের মতো উদ্ভিদের জন্যও খাদ্য অপরিহার্য।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, উদ্ভিদ-দেহে ৯০-টিরও বেশি রাসায়নিক উপাদানের অস্তিত্ব রয়েছে। এসবের মধ্যে ষোলটি উদ্ভিদের বিকাশ বৃদ্ধি বিকাশের জন্য অপরিহার্য যাদের অত্যাবশ্যক উদ্ভিদ খাদ্যোপাদান বলে। এসব রাসায়নিক উপাদান উদ্ভিদের মাধ্যমে প্রাণীরা তথা আমরা ভোগ করে থাকি। যার ফলে প্রাণীদেহের বৃদ্ধি-বিকাশ হয়ে থাকে। অর্থাৎ বলা যায় পরোক্ষভাবেই মাটি দ্বারাই আমাদের শরীর গঠিত।
আমরা সচারাচর বায়ু দূষণ জলজ পরিবেশ দূষণ নিয়ে আলাপ আলোচনা শুনি। এসব চোখের সামনে সংঘটিত হয় এবং পরির্বতন সহজেই পরিমাপ করা হয় বলে আলোচিত হয়। শুধু আর্সেনিক তথা মৃত্তিকা দূষণ নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে আলোচনা দেখা গেছে। কিন্তু মাটির দূষণের মাত্রা ও এর ক্ষতির প্রভাব কতটা ভয়াবহ হচ্ছে তা আমরা কখনোই আলোচনা করি না। আর মৃত্তিকা দূষণের প্রধান কারণ মানুষের অবিবেচিত ক্রিয়াকালাপ।
মাটি দূষণের সজীব (রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস, ব্যকটেরিয়া ইত্যাদি) ও অজীব (অজৈব- সালফেট, পারদ, সীসা; জৈব- পেস্টিসাইড) দূষক এর উৎসমূলে মনুষ্যসৃষ্ট ক্রিয়াকালাপই। গবেষণায় দেখা যায়- মাটি দূষণের মূল কারণ- প্রথমত- শিল্প-কারখানার নিংসৃত বর্জ্য দ্বিতীয়ত- কৃষিকাজে অযাচিত অতিরিক্ত ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, বিষ তৃতীয়ত- পৌর-গার্হস্থ্য বা হাসপাতাল জঞ্জাল বা অর্বজনা এবং চতুর্থত- দূর্ঘটনা জনিত তেল কিংবা রাসায়নিক পদার্থ।
মানুষের সেই ক্রিয়া কর্মে অবিবেচিত ব্যবহারে সেই র্উবর মাটিকে কলুষিত করছে। মানুষ ভূমিকে প্রকৃতিক সম্পদ অপেক্ষা ভোগ্যবস্তুর যোগানদাতা হিসাবে বেশি ভেবেছে। তাই প্রাকৃতিক এই উপাদনকে মানুষের লোভজনিত অত্যধিক ও অবিবেচিত ব্যবহারের ফলে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাস্তুতন্ত্রে পুষ্টিচক্রের মূলে যে মাটি তা কখনোই বিবেচিত হয়না। মৃত্তিকার গুনাবলীর অবাঞ্চিত হ্রাস বা বৃদ্ধিতে জীবজগতের অমঙ্গল বয়ে আনছে। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদেরজন্য কোন কোন ভারী ধাতু যেমন- ক্যাডমিয়াম, পারদ, সিসা ইত্যাদির চাহিদার জীবের জন্য উপকার লক্ষ্য করা যায়নি। এসকল ভারী ধাতুর পরিমান মাটিতে বৃদ্ধি পেলে তা মানুষ ও অন্যান্য জীবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিসাধন করে। ভারী ভারী ধাতু বিশেষকরে সীসার বিষক্রিয়াজনিত কারনে মানুষের হিমোগ্লোবিন সংশ্লেষণে বাধা, অ্যানিমিয়া, মস্তিষ্ক ও বৃক্ক কোষের ধ্বংসপ্রাপ্তি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, গর্ভপাত বা মৃতসন্তান প্রসবসহ ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল রোগ সৃষ্টি করে। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে প্রাণীদেহের জিনের বিরূপ পরির্বতনে এই দূষণ প্রভাবিত করে। গ্লোবাল অ্যালাইন্স অন হেল্থ এন্ড পলিউশন কর্তৃক ২০১৫ সালে এক গবেষণায় দেখা গেছে- বাংলাদেশে মানুষ মোট মৃতের ২৬.৬০ শতাংশ পানি, বায়ু ও মাটি দূষণ দায়ী।
ভারীধাতু ফসল দ্বারা শোষিত হয়ে খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে যে বাংলাদেশে উৎপাদিত পেঁয়াজে ক্ষতিকর মাত্রায় সিসার উপস্থিত পেয়েছে। সেখানকার হেলথ এন্ড মেটাল হাইজিন বিভাগ ক্ষতিকর মাত্রায় সিসার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা শিম পরিক্ষা করে তাতে ফেনপ্রোপেথিন, অমিথোয়েট, ডাইমোথোয়েটের মতো বিষাক্ত পর্দাথের উপস্থিতি পেয়েছে যুক্তরাজ্য। বিষয়টি যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছে লন্ডনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। (তথ্যসূত্র- দৈনিক বণিকর্বাতা তারিখ ২৪-১২-২০১৯)। এর পূর্বে বাংলাদেশে উৎপাদিত হলুদে সিসার পরিমান বেশি থাকায় বাংলাদেশ হতে আমদানি বন্ধ করে দেয়।
ভূমিকে কোন রাসায়নিকগারে কৃত্রিম উপায়ে তৈরী করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিগতভাবে ১ ইঞ্চি মাটি তৈরী হতে সাধারণভাবে ২০০-১০০০ বছর সময় লাগে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভ্যতার সংকট-এ বলেছেন ‘প্রকৃতিকে অতিক্রম করে কিছু দূর সয়, তারপর আসে বিনাশের পালা’। তাই ভূমি ক্ষয় ও দূষণ হতে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হল ভূমি সংরক্ষণ ও দূষিত হতে না দেয়া। এজন্য পরিবেশের সাথে সংগতিপূর্ন শিল্প-প্রযুক্তির উন্নয়ন, রাসায়নিক সার বিষের পরির্বতে জৈব কৃষির আনয়ন এবং জঞ্জাল পরিচালনের পাঁচটি উপায়- ল্যান্ডফিলিং, ইনসিনারেশান, রিসাইক্লিং, বায়োরেমিডিয়েশান ও ফাইটোরেমিডিয়েশান দূষণ হ্রাস করা জরুরী।
রতন মণ্ডল
(কৃষিবিদ, কলাম লেখক ও ‘দেশীগাছ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আন্দোলন’ এর উদ্যোক্তা)


