ঢাকাসোমবার , ২৩ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

বিজ্ঞানের জাদুতে ২ সপ্তাহে ক্যান্সার মুক্ত শরীর!

বিপ্লব হোসাইন
মার্চ ২৩, ২০২৬ ৮:১১ পূর্বাহ্ণ । ১৩ জন

ক্যান্সার মানেই এক সময় ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে ‘CAR-T’ সেল থেরাপি গত কয়েক বছরে রক্তের ক্যান্সারের চিকিৎসায় অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। তবে এই থেরাপির সবচেয়ে বড় বাধা ছিল এর আকাশচুম্বী খরচ এবং অত্যন্ত জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়া। এবার সেই বাধা দূর করতে সক্ষম হয়েছেন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া সান ফ্রান্সিসকো (UCSF)-এর একদল গবেষক। তারা এমন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা সরাসরি রোগীর শরীরের ভেতরেই রোগ প্রতিরোধক কোষগুলোকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়তে নতুনভাবে ‘প্রোগ্রাম’ করতে পারে।

প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ও নতুন চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে প্রচলিত CAR-T থেরাপিতে রোগীর শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তার ভেতর থেকে টি-সেল (T-cells) আলাদা করা হয়। এরপর সেই কোষগুলোকে একটি বিশেষায়িত ল্যাবে পাঠানো হয়, যেখানে সেগুলোর জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে পুনরায় রোগীর শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং এর খরচ প্রায় ৪ থেকে ৫ লক্ষ ডলার (কয়েক কোটি টাকা)। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চিকিৎসার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকাকালীনই রোগীর অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। নতুন এই ‘ইন-ভিভো’ (In-vivo) পদ্ধতি এই দীর্ঘ সময় এবং বিশাল খরচ-উভয় সমস্যারই সমাধান দেবে।

শরীরের ভেতর যেভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি
গবেষকরা একটি ‘দ্বি-কণা সরবরাহ ব্যবস্থা’ (Two-particle delivery system) তৈরি করেছেন। এটি অনেকটা একটি সূক্ষ্ম কুরিয়ার সার্ভিসের মতো কাজ করে। প্রথম কণাটি রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ‘টি-সেল’ খুঁজে বের করে এবং তার সাথে যুক্ত হয়। এরপর দ্বিতীয় কণাটি সেই কোষের ভেতরে CRISPR-Cas9 নামক একটি ‘আণবিক কাঁচি’ এবং নতুন ডিএনএ নির্দেশাবলী পৌঁছে দেয়। এই নির্দেশের ফলে কোষগুলো শরীর থেকে বের না হয়েই ‘কাইমেরিক অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর’ (CARs) তৈরি করতে শুরু করে। এই রিসেপ্টরগুলো সেন্সরের মতো কাজ করে ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করে এবং সেগুলোকে ধ্বংস করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

গবেষণায় অবিশ্বাস্য সাফল্য ও ফলাফল
‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে। মানুষের মতো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পন্ন ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র একটি ইনজেকশন দেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই আক্রমণাত্মক লিউকেমিয়া আক্রান্ত শরীরের প্রায় সব ক্যান্সার কোষ নির্মূল হয়ে গেছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, ল্যাবে তৈরি কোষের চেয়ে শরীরের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে রূপান্তরিত হওয়া এই কোষগুলো অনেক বেশি সতেজ এবং দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে। এছাড়া এই পদ্ধতিটি মাল্টিপল মায়েলোমা এবং কঠিন টিউমারের (Solid Tumors) বিরুদ্ধেও শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

চিকিৎসার গণতন্ত্রীকরণ ও আগামীর সম্ভাবনা
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ড. জাস্টিন আইকেম বলেন, “এটি ক্যান্সার চিকিৎসার সহজলভ্যতাকে সত্যিকার অর্থে সবার জন্য উন্মুক্ত বা ‘গণতান্ত্রিক’ করবে।” বর্তমানে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা কেবল উন্নত দেশের বড় বড় ক্যান্সার সেন্টারগুলোতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই পদ্ধতি সফলভাবে মানুষের ওপর প্রয়োগ করা সম্ভব হলে সাধারণ কমিউনিটি হাসপাতালেও ক্যান্সার থেরাপি দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে কেমোথেরাপির মতো কষ্টদায়ক এবং ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পন্ন চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাও অনেকটা কমে আসবে।

যদিও এই প্রযুক্তিটি এখনও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অপেক্ষায় রয়েছে, তবুও এটি ক্যান্সার গবেষণায় একটি বিশাল মাইলফলক। জীবন রক্ষাকারী এই থেরাপিকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসতে গবেষকরা ‘অ্যাজালিয়া থেরাপিউটিক্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানও চালু করেছেন। যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ক্যান্সার চিকিৎসার দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যাবে এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র ও গবেষণাপত্র (Reference)
মূল শিরোনাম: “In vivo site-specific engineering to reprogram T cells”
প্রধান লেখক: উইলিয়াম এ. নাইবার্গ, পিয়ের-লুই বার্নার্ড এবং জাস্টিন আইকেম (পিএইচডি)।
প্রকাশনা সংস্থা: নেচার (Nature) জার্নাল।
প্রকাশের তারিখ: ১৮ই মার্চ, ২০২৪।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান: ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া সান ফ্রান্সিসকো (UCSF), গ্ল্যাডস্টোন ইনস্টিটিউটস এবং ইনোভেটিভ জেনোমিক্স ইনস্টিটিউট।