ঢাকারবিবার , ১১ জানুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

কেন মনোসামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আধুনিক ব্যবসার সাফল্যের চাবিকাঠি?

বিপ্লব হোসাইন
জানুয়ারি ১১, ২০২৬ ১:০৫ অপরাহ্ণ । ১৩৭ জন

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার ধারণা আর কেবল হেলমেট, গ্লাভস বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক শিল্প সংস্কৃতিতে কর্মীদের শারীরিক নিরাপত্তার সমান্তরালে ‘মনোসামাজিক বিপদ’ (Psychosocial Hazards) ব্যবস্থাপনা এখন একটি মৌলিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করলে কেবল কর্মীর ক্ষতি হয় না, বরং এটি উৎপাদনশীলতা হ্রাস, উচ্চ কর্মী টার্নওভার এবং গুরুতর আইনি জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোসামাজিক বিপদ কী এবং কেন এটি উদ্বেগের কারণ?
মনোসামাজিক বিপদ বলতে কর্মক্ষেত্রের এমন সব সামাজিক ও মানসিক কারণকে বোঝায় যা একজন কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য বা সুস্থতার ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, অবাস্তব ডেডলাইন, ভূমিকার অস্পষ্টতা, কর্মক্ষেত্রে বুলিং বা হয়রানি এবং নেতৃত্বের অভাব এর অন্যতম উদাহরণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক ঝুঁকি সরাসরি দৃশ্যমান হলেও মনোসামাজিক ঝুঁকিগুলো অনেক সময় পর্দার আড়ালে থেকে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এসব ঝুঁকির সংস্পর্শে থাকলে কর্মীর মধ্যে বার্নআউট, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং পেশাদারী কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

আইনি প্রেক্ষাপট: অস্ট্রেলিয়া ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অনেক দেশই কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। বিশেষ করে ISO 45003:2021 মানদণ্ডটি বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নির্দেশিকা প্রদান করছে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ভিক্টোরিয়া রাজ্যসহ অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চলে মনোসামাজিক বিপদ ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে কোম্পানিগুলো এখন আইনিভাবে বাধ্য তাদের কর্মীদের মানসিকভাবে নিরাপদ কাজের পরিবেশ দিতে। নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের জরিমানা ও বীমা দাবির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা ব্যবসা পরিচালনায় নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ করেছে।

প্রথাগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি-যা সাধারণত ‘সম্ভাবনা’ ও ‘পরিণতি’র ওপর ভিত্তি করে কাজ করে-মানসিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে প্রায়ই ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ, মনোসামাজিক ঝুঁকিগুলো স্থির নয়; এগুলো সামাজিক গতিশীলতা ও নেতৃত্বের আচরণের ওপর নির্ভরশীল। শারীরিক আঘাতের মতো এগুলোকে দ্রুত পরিমাপ করা যায় না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে জমা হওয়া মানসিক চাপ কীভাবে একজন কর্মীকে প্রভাবিত করছে, তা শনাক্ত করতে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ এবং কর্মীদের সাথে নিয়মিত মিথস্ক্রিয়া প্রয়োজন।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সমাধান: জিআরসি (GRC) সফটওয়্যারের ভূমিকা
জটিল এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি বা GRC (Governance, Risk, and Compliance) সফটওয়্যার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই সফটওয়্যারগুলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে মনোসামাজিক ঝুঁকি শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন এবং পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দিচ্ছে।

সফটওয়্যারের মাধ্যমে কর্মীরা নাম প্রকাশ না করেও তাদের মানসিক উদ্বেগের কথা রিপোর্ট করতে পারছেন। পালস সার্ভে এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে ম্যানেজমেন্ট বুঝতে পারছে কোন বিভাগে চাপ বেশি এবং কোথায় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এর ফলে কেবল আইনি বাধ্যবাধকতাই পূরণ হচ্ছে না, বরং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি স্বচ্ছ ও আস্থার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।

সুস্থ কর্মসংস্কৃতিই ব্যবসার ভবিষ্যৎ
পরিশেষে বলা যায়, মনোসামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কেবল আইনি কমপ্লায়েন্স বা জরিমানা এড়ানোর বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী সফলতার চাবিকাঠি। যে প্রতিষ্ঠান কর্মীর মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে কর্মীদের কাজের প্রতি সম্পৃক্ততা বেশি থাকে এবং অনুপস্থিতির হার কমে যায়।

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মেধাবী কর্মীদের ধরে রাখতে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা করতে মনোসামাজিক বিপদ ব্যবস্থাপনাকে দৈনন্দিন কার্যক্রমে একীভূত করার কোনো বিকল্প নেই। শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার এই ভারসাম্যই আগামী দিনের আধুনিক কর্মক্ষেত্রের মূল ভিত্তি হবে।