
আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে কাজের চাপ, পারিবারিক ব্যস্ততা এবং নানা অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সামান্য দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক হলেও যখন তা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন তা দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, কাজ এবং সম্পর্কের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত এই মানসিক চাপ বা উদ্বেগ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকরী কিছু কৌশল তুলে ধরেছে জনপ্রিয় স্বাস্থ্য পোর্টাল ‘হেলথলাইন’। কীভাবে এই মানসিক অবসাদ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
গভীর ও দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া :
হঠাৎ করে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ভর করলে শরীর ও মনকে শান্ত করার সবচেয়ে দ্রুত এবং কার্যকরী উপায় হলো গভীর শ্বাস নেওয়া। চিকিৎসকদের মতে, ধীরে ধীরে নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রেখে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দিলে মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়। এটি শরীরের উচ্চ রক্তচাপ ও দ্রুত হৃদস্পন্দনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া :
অ্যাংজাইটিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই ভবিষ্যতে কী হবে বা অতীতে কী ঘটেছে তা নিয়ে অতিরিক্ত ভেবে থাকেন। মনকে এই কাল্পনিক ভয় থেকে বের করে বর্তমানে ফিরিয়ে আনতে ‘গ্রাউন্ডিং টেকনিক’ অত্যন্ত কার্যকর। যেমন— চোখের সামনে দৃশ্যমান পাঁচটি জিনিস দেখা, তিনটি নির্দিষ্ট শব্দ শোনা বা শরীরের ত্বকে স্পর্শের অনুভূতি অনুভব করা। এই সহজ পদ্ধতিটি মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিকভাবে বর্তমান বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে।
ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল সীমিত করা :
অতিরিক্ত কফি, চা বা এনার্জি ড্রিংক পানের অভ্যাস অনেক সময় স্নায়ুর উত্তেজনা, বুক ধড়ফড়ানি এবং অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। ক্যাফেইন শরীরের কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে অ্যাংজাইটির লক্ষণগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। তাই উদ্বেগের সমস্যা থাকলে ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও নড়াচড়া :
ব্যায়াম কেবল শরীরের ফিটনেসই বজায় রাখে না, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও এক মহৌষধ। নিয়মিত হালকা হাঁটাচলা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা বা ইয়োগা করার ফলে শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ ও ‘ডোপামিন’ নামক ফিল-গুড হরমোন নিঃসৃত হয়। এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই মানসিক চাপ ও অ্যাংজাইটি কমাতে এবং মন মেজাজ চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা :
ঘুমের অনিয়মিত অভ্যাস এবং মানসিক চাপের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ রয়েছে। রাতে পর্যাপ্ত বা মানসম্মত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং মানুষ খুব দ্রুত খিটখিটে ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। প্রতিদিন রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করা মানসিক শান্তি বজায় রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত।
নিজের অনুভূতি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা :
মনের ভেতর জমে থাকা ভয় বা দুশ্চিন্তা একা একা বয়ে বেড়ানো অ্যাংজাইটি আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বস্ত কোনো বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা জীবনসঙ্গীর কাছে নিজের মনের কথা খুলে বললে বা অনুভূতি শেয়ার করলে মনের ওপর থেকে অনেক বড় একটা মানসিক চাপ হালকা হয়ে যায়।
ডায়েরি লেখা বা মনের ভাব প্রকাশ করা :
অনেক সময় মুখে বা সবার সামনে নিজের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে একটি ডায়রি বা নোটবুকে নিজের চিন্তাভাবনা ও ভয়ের কারণগুলো লিখে ফেলা দারুণ এক থেরাপি হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্ককে গোছাতে এবং সমস্যাগুলো ঠান্ডা মাথায় মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে।
পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া :
যদি জীবনযাত্রার ছোটোখাটো পরিবর্তন এনেও দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাক নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে নিজে নিজে চেষ্টা না করে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)-সহ বিভিন্ন পেশাদার চিকিৎসা পদ্ধতি অ্যাংজাইটি থেকে মুক্তি পেতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাংজাইটি কোনো স্থায়ী রোগ নয়, বরং সঠিক সচেতনতা, জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।