ঢাকাবুধবার , ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

মার্কিন গণতন্ত্রের সূচক ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, বাংলাদেশর উন্নতি

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৬ সকাল

Link Copied!

দশক পর দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে নিজেকে ‘গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা’ (প্রধান রক্ষাকর্তা) হিসেবে জাহির করে আসছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নির্বাচন নিয়ে কারচুপি, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অজুহাত পেলেই ওয়াশিংটন মুহূর্তের মধ্যে আসরে নেমে পড়ে। গণতন্ত্র ও সুশাসনের অভাবের অভিযোগ তুলে উন্নয়নশীল বা ভিন্নমতের দেশগুলোর ওপর পঙ্গু করার মতো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ, রাজনৈতিক মদদ প্রত্যাহার কিংবা সরাসরি সামরিক আগ্রাসন ও হামলা চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না দেশটি।

অথচ, স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক আন্তঃসরকার থিংক ট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স’(আইডিইএ)-এর সাম্প্রতিক বার্ষিক গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি প্রতিবেদনেখোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের গণতান্ত্রিক সূচক আজ গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। যে রাষ্ট্রটি বিশ্বকে গণতন্ত্রের সবক শেখাতে ব্যস্ত, তাদের নিজেদের ঘরই আজ চরম প্রাতিষ্ঠানিক পতন, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আইনের শাসনের তীব্র সংকটে জর্জরিত।

বিশেষ করে মার্কিন রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক আক্রমণ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনের শাসন মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে এই বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান গণতান্ত্রিক আন্দোলন, তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বহুমুখী চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রে অবনতির মূল ক্ষেত্রসমূহ :
ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া-এর গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি প্রতিবেদনে ১৯৭৫ সাল থেকে বিশ্বের ১৭৪টি দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমবারের মতো ‘গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ’ করা দেশের তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যার সূচনা হয়েছিল মূলত ২০১৯ সাল থেকে। বর্তমান প্রশাসনের আমলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিরপেক্ষ অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলো তীব্র ও অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) নষ্ট হওয়ার কারণে মার্কিন গণতন্ত্র আজ ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সন্ধিক্ষণ পার করছে।

ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার মহাসচিব কেভিন কাসাস-জামরা মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিন রাজনীতিতে নির্বাচন অস্বীকৃতির যে বিপজ্জনক প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা বিশ্বব্যাপী এক নতুন মহামারীতে রূপ নিয়েছে এবং অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছে।

দ্বিমুখী নীতি এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ :
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ছবক’। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়া—বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ত্রুটির অজুহাত তুলে কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। আবার কোথাও গণতন্ত্র উদ্ধারের ‘মহৎ’ উদ্দেশ্যে সামরিক অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে এবং আস্ত রাষ্ট্র কাঠামোগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে।

অথচ এই একই যুক্তরাষ্ট্র যখন অভ্যন্তরীণভাবে ভোটার দমনপীড়ন, বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নির্বাচন ফলাফল অস্বীকারের সংস্কৃতি এবং উগ্র পপুলিজমের জালে বন্দি হয়ে পড়ে, তখন তাদের এই ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অত্যন্ত নগ্নভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়।

আমেরিকার অন্দরমহলের পতন :
আইডিইএ-এর সাম্প্রতিক গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক বছর ধরে যে ‘গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ’ শুরু হয়েছে, তা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা বিগত অর্ধশতাব্দীতেও দেখা যায়নি। বর্তমান প্রশাসনের আমলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ চালানো হচ্ছে। মার্কিন রাজনীতিতে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলকে অস্বীকার করার যে সংস্কৃতি ডালপালা মেলেছে, তাকে স্বয়ং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান ‘বিশ্বব্যাপী নতুন মহামারী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক সংকট :
যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কেবল দেশটির নিজেদের সীমানার মধ্যে বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর এক সুদূরপ্রসারী ও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল টানা ১১তম বছর যেখানে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক সূচকে উন্নতি করা দেশের চেয়ে অবনতি হওয়া দেশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। এটি এই স্বনামধন্য থিংক ট্যাংকের রেকর্ডের দীর্ঘতম ধারাবাহিক পতন।

বিশ্বব্যাপী বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও নির্বাচন ব্যবস্থার মান গত অন্তত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। বিশেষ করে আইনগত শাসনের বর্তমানে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, যেখানে ৪১ শতাংশ মূল্যায়নকৃত দেশ নিম্ন বা অত্যন্ত অসন্তোষজনক স্কোর অর্জন করেছে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক সংঘাতে এর ভূমিকা :
ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার মহাসচিব কেভিন কাসাস-জামরার বক্তব্য অনুযায়ী, গণতন্ত্রের গুণগত মানের এই ক্রমাবনতি বিশ্বজুড়ে সংঘাত, যুদ্ধ ও সহিংসতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালটি তাদের ১৯৪৬ সাল থেকে সংকলিত ঐতিহাসিক ডেটাসেটে সবচেয়ে বেশি সহিংস ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতে পূর্ণ একটি বছর ছিল।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ঐতিহ্যগত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক আদেশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রচার থেকে সরে আসে, তখন তা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন একনায়ক, স্বৈরাচারী ও পপুলিস্ট নেতাদের আরও বেশি বেপরোয়া, আগ্রাসী ও উৎসাহিত করে তোলে। এর ফলে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক পটপরিবর্তন :
প্রতিবেদনের ইতিবাচক, আলোকোজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে ও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোতে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও সাহসী আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে থাকা কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসকদের পতন ঘটেছে। বৈশ্বিক গণতন্ত্রের এই চরম সংকটাপন্ন ও হতাশাজনক সময়ে তরুণদের এই রাজনৈতিক জাগরণ, আত্মত্যাগ ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রকামী ও নিপীড়িত মানুষের জন্য নতুন আশার আলো ও অনুপ্রেরণার সঞ্চার করেছে।

সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা :
তবে আন্তর্জাতিক গবেষক ও বিশ্লেষকরা একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন যে, স্বৈরাচার পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী, টেকসই এবং বড় ধরনের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধন করা অত্যন্ত জটিল, কন্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। কেবল ক্ষমতার পালাবদলই গণতন্ত্রের পূর্ণতা আনে না; এর জন্য প্রয়োজন গভীর সাংবিধানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, নির্বাচন ব্যবস্থার সার্বিক পুনর্গঠন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

সামগ্রিকভাবে, মার্কিন গণতন্ত্রের ধারাবাহিক অবক্ষয় এবং বাংলাদেশের মতো দেশে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন গণতান্ত্রিক লড়াই ও সংস্কারের প্রচেষ্টা—উভয় ঘটনাই বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির এক যুগসন্ধিক্ষণ ও ঐতিহাসিক মোড়কে নির্দেশ করছে, যা আগামী দিনের বিশ্ব ব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণ করবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

২০৩০ সালের মধ্যে ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করবে পিডিবি

সিলেটের পর্যটন-চা ও শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

দেশের ৫ বিভাগে ভারী বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা

খিলক্ষেতে ট্রেনের ধাক্কায় অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যু

চাঁদপুরে ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২

চিরিরবন্দরে ধানখেতে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু

vivo V80 Lite: A Perfect Fit for Everyday Lifestyles

স্মার্ট লাইফের পারফেক্ট সঙ্গী ভিভো ভি৮০ লাইট

‘Redmin Horizon 2026’ Held to Build a Self-Reliant Bangladesh in the Chemical and Industrial Sector

কেমিক্যাল ও শিল্পখাতে স্বনির্ভরতার অঙ্গীকার নিয়ে ‘রেডমিন হরাইজন -২০২৬’আয়োজন

বিশ্বজুড়ে তীব্র হচ্ছে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ, বাড়ছে বিপদের ঘণ্টা

মার্কিন গণতন্ত্রের সূচক ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, বাংলাদেশর উন্নতি