
বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও নানা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য উদ্যোগ সত্ত্বেও শিশুদের ক্ষেত্রে এইচআইভি ও এইডস-এর ভয়াবহতা আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যের বরাতে পরিবেশ ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সাময়িকী ‘ডাউন টু আর্থ’- এর প্রতিবেদনে এই করুণ বাস্তবতা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালজুড়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৬০ জন শিশু নতুন করে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। একইসঙ্গে সময়মতো শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (এআরটি) চিকিৎসার অভাবে এইডসজনিত জটিলতায় প্রতিদিন গড়ে ২০০ জন শিশুর করুণ মৃত্যু ঘটেছে।
প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেবল ২০২৫ সালেই ১৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৯৩ হাজার শিশু নতুন করে এইচআইভি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। এই নতুন সংক্রমণের ফলে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এইচআইভি নিয়ে জীবনযাপন করা ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখ ৬০ হাজারে (১.২৬ মিলিয়ন)। উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা ও সমন্বিত পরিকল্পনা পৌঁছাতে না পারায় শিশু স্বাস্থ্য খাতে মারাত্মক হুমকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। তথ্যমতে, আক্রান্ত ও ঝুঁকিতে থাকা মোট শিশুদের প্রায় ৮৭ শতাংশই আফ্রিকান সাব-সাহারান অঞ্চলের বাসিন্দা। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, চরম দারিদ্র্য, দ্রুত প্রাক-জন্ম রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার অভাব এবং সঠিক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের অপ্রতুলতার কারণেই শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও অকালমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
তবে বিগত কয়েক দশকের তুলনায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও চিহ্নিত করেছে ইউনিসেফ। ২০১০ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘মা থেকে শিশুতে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ’ (পিএমটিসিটি) কর্মসূচির কারণে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে নতুন সংক্রমণের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি ২০০১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এসে এইডসজনিত শিশু মৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ৮৪ শতাংশ।
ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক প্রয়াস এখনও বেশ পিছিয়ে রয়েছে। সঠিক সামাজিক সচেতনতা ও সমন্বিত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে এই বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রতিনিয়ত নতুন সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এছাড়া এইচআইভি ও এইডসের কারণে ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ শিশু পিতামাতা কিংবা উভয়কে হারিয়ে এতিম ও অনাথ হয়ে পড়েছে। অভিভাবকহীন এসব শিশু চরম সামাজিক বৈষম্য, বাসস্থানহীনতা এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার মুখে দিনাতিপাত করছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং বিশ্বকে শিশুদের জন্য এইচআইভিমুক্ত করতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি সাব-সাহারান আফ্রিকাসহ দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি বিনামূল্যে পরীক্ষা কেন্দ্র ও নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তহবিল বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাসমূহের সমন্বিত পদক্ষেপ জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।