ঢাকারবিবার , ২৯ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

আজকের সর্বশেষ সবখবর

করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে যা জানা জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ২৯, ২০২৬ ৩:৫০ অপরাহ্ণ । ১৯ জন

একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে মানবসভ্যতা সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারীর মাধ্যমে। এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিভিন্ন প্রযুক্তির টিকা বা ভ্যাকসিন। অতি অল্প সময়ে উদ্ভাবিত এই টিকাগুলো কেবল মৃত্যুহারই কমায়নি, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে পুনরায় সচল করতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তৈরি এই ভ্যাকসিনগুলোতে ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য অত্যাধুনিক সব উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশেও সরকারি উদ্যোগে অত্যন্ত সফলতার সাথে গণ-টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে, যা দেশের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছে। মূলত টিকার ধরণ, এর অভ্যন্তরীণ উপাদানের কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের জন্য জরুরি।

বৈশ্বিক ও বাংলাদেশে টিকার ব্যবহার
করোনা মহামারীর শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু টিকা জীবন রক্ষাকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ফাইজারের ‘কোমীরনাটি’ এবং মডার্নার ‘স্পাইকভ্যাক্স’ যেমন উন্নত বিশ্বে জনপ্রিয়, তেমনি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, সিনোফার্ম এবং সিনোভ্যাকের মতো টিকাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে মূলত ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের ‘কোভিশিল্ড’ দিয়ে টিকাদান শুরু হলেও পরবর্তীতে চীনের সিনোফার্ম এবং কোভ্যাক্সের আওতায় ফাইজার ও মডার্না ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে ২০২৫-২৬ সালেও বিভিন্ন দেশে এই টিকাগুলোর আপডেট সংস্করণ বুস্টার হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।

টিকার কার্যপদ্ধতি ও সক্রিয় উপাদান
টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর সক্রিয় উপাদান, যা শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত করে। ফাইজার ও মডার্না ব্যবহার করে mRNA প্রযুক্তি, যা শরীরের কোষকে ভাইরাসের একটি অংশ (স্পাইক প্রোটিন) তৈরি করতে শেখায়। সিনোফার্ম বা সিনোভ্যাকের মতো টিকায় ব্যবহৃত হয় নিষ্ক্রিয় ভাইরাস, যা রোগ ছড়াতে পারে না কিন্তু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সজাগ করে তোলে। আবার অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও জনসন অ্যান্ড জনসন টিকায় ভাইরাল ভেক্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যেখানে একটি নিরীহ বাহক ভাইরাসের মাধ্যমে করোনার ডিএনএ কোড শরীরে প্রবেশ করানো হয়।

সংরক্ষণ ও স্থিতিশীলতায় সহায়ক উপাদান
টিকার সক্রিয় অংশকে শরীরের গভীরে পৌঁছে দিতে এবং বোতলের ভেতর একে সুরক্ষিত রাখতে কিছু সহায়ক উপাদান ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে mRNA টিকাগুলোতে লিপিড বা চর্বির কণা ব্যবহার করা হয়, যা সংবেদনশীল উপাদানের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া টিকার অম্লতা বা পিএইচ (pH) ভারসাম্য বজায় রাখতে সোডিয়াম ক্লোরাইড বা পটাশিয়াম ক্লোরাইডের মতো বিভিন্ন লবণ ব্যবহৃত হয়। অতি নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণের সময় টিকার গুণমান যেন ঠিক থাকে এবং অণুগুলো জমাট না বাঁধে, সেজন্য সাধারণ চিনি বা সুক্রোজ ব্যবহার করা হয়।

প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অ্যাডজুভ্যান্ট ও বাফার
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও বেশি শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী করতে কিছু টিকায় (যেমন সিনোফার্ম) অ্যাডজুভ্যান্ট হিসেবে অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইড ব্যবহার করা হয়। এছাড়া টিকা সংরক্ষণের সময় এর দীর্ঘমেয়াদী গুণমান নিশ্চিত করতে ট্রিস বা ট্রোমেথামিনের মতো বাফার বা অ্যাসিড স্ট্যাবিলাইজার যুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য যে, আধুনিক এই টিকাগুলোতে সাধারণ ভ্যাকসিনে থাকা ডিম, ল্যাটেক্স বা পারদের মতো ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়নি, যা একে অনেকের জন্য নিরাপদ করে তুলেছে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও স্বাস্থ্য সচেতনতা
যেকোনো ওষুধের মতো করোনা টিকারও কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, যা মূলত শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ। ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা, হালকা জ্বর, শরীর ম্যাজম্যাজ করা বা ক্লান্তি সাধারণত ১-৩ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। যদিও খুব বিরল ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের প্রদাহ বা রক্ত জমাট বাঁধার মতো জটিলতার কথা শোনা যায়, তবে এর হার বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত নগণ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির তুলনায় টিকার উপকারিতা অনেক বেশি। দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো বুস্টার ডোজ নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সর্বোত্তম পন্থা।