ঢাকামঙ্গলবার , ২৪ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

বিশ্ববাজারে অস্ত্র রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ দেশ: এক নজরে বর্তমান পরিসংখ্যান

বিপ্লব হোসাইন
মার্চ ২৪, ২০২৬ ৭:১১ পূর্বাহ্ণ । ১০ জন

বর্তমান পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা এক নতুন রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে দেশগুলো যেমন নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াচ্ছে, তেমনি বিশ্ব অস্ত্র বাজারেও দেখা দিচ্ছে বড় ধরনের মেরুকরণ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী অস্ত্র হস্তান্তরের প্রবাহ গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এই বাজারকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে। উন্নত প্রযুক্তির লড়াই, কৌশলগত মিত্রতা এবং দ্রুত অস্ত্র সরবরাহের সক্ষমতাই এখন নির্ধারণ করে দিচ্ছে বিশ্ব অস্ত্র বাজারে কার দাপট কতটা থাকবে।

দেশভিত্তিক বিস্তারিত পরিসংখ্যান

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৪২% – অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বনেতা)
বর্তমানে বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারের সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। ৪২ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব নিয়ে তারা সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার জেট (F-35), ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নজরদারি প্রযুক্তিতে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অটুট। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে অনেক দেশ এখন মার্কিন অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে, যা তাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিয়েছে।

২. ফ্রান্স (১০% – দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী)
ফ্রান্স বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। তাদের ১০ শতাংশ বাজার দখলের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ‘রাফাল’ ফাইটার জেট। ভারত, কাতার এবং মিশরসহ বিভিন্ন দেশ ফরাসি প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখছে। রাশিয়াকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা ফ্রান্সের সামরিক বাণিজ্যের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক।

৩. রাশিয়া (৭% – নিম্নমুখী অবস্থান)
এক সময়ের সামরিক পরাশক্তি রাশিয়ার রপ্তানি বাজার বর্তমানে বড় ধরনের সংকটে। বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশ বাজার নিয়ে তারা তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে নিজেদের অস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা আগের মতো বিদেশে অস্ত্র সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে দীর্ঘদিনের পুরনো ক্রেতারাও এখন বিকল্প দেশ খুঁজছে।

৪. জার্মানি (৬% – চীনকে পেছনে ফেলে চতুর্থ)
জার্মানি সম্প্রতি বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে বড় চমক দেখিয়েছে। তারা চীনকে ছাড়িয়ে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। জার্মানিতে তৈরি সাবমেরিন, ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যানের চাহিদা ইউরোপজুড়ে ব্যাপক হারে বেড়েছে। ইউরোপের নিরাপত্তা উদ্বেগ জার্মানির প্রতিরক্ষা উৎপাদনকে আরও গতিশীল করেছে।

৫. চীন (৬% – আঞ্চলিক প্রভাব)
চীনের অবস্থান বর্তমানে পঞ্চম স্থানে। যদিও তারা বিশ্বের একটি বড় শক্তি, তবে তাদের অস্ত্রের বাজার মূলত এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো চীনের বড় ক্রেতা। তবে উন্নত প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় জার্মানি ও ফ্রান্সের কাছে তারা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।

৬. ইতালি (৫% – ইউরোপীয় প্রযুক্তির প্রসার)
ইতালি ৫ শতাংশ বাজার দখল করে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। তাদের নৌ-প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং হেলিকপ্টার বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোতে ইতালীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

৭. ইসরায়েল (৪% – উচ্চপ্রযুক্তি ও ড্রোন বিশেষজ্ঞ)
ইসরায়েল মূলত তাদের আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ড্রোন (UAV) সিস্টেমের জন্য পরিচিত। ৪ শতাংশ বাজার নিয়ে তারা সপ্তম স্থানে। ভারতের মতো বড় দেশগুলো ইসরায়েলি রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ক্রেতা। ছোট দেশ হলেও তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী।

৮. যুক্তরাজ্য (৩% – ধারাবাহিক সরবরাহকারী)
৩ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্য অষ্টম স্থানে রয়েছে। তারা মূলত যুদ্ধবিমান এবং নৌ-প্রযুক্তি রপ্তানিতে পারদর্শী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে বিভিন্ন সামরিক প্রজেক্টে কাজ করার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে তাদের অবস্থান এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

৯. দক্ষিণ কোরিয়া (৩% – দ্রুততম বর্ধনশীল শক্তি)
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় চমকের নাম দক্ষিণ কোরিয়া। ৩ শতাংশ বাজার নিয়ে নবম স্থানে থাকলেও তারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে। তাদের মূল শক্তি হলো কম সময়ে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত মানের ট্যাংক ও আর্টিলারি সরবরাহ করা। পোল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো এখন দক্ষিণ কোরিয়ার বড় ক্রেতা।

১০. স্পেন (২% – ইউরোপীয় জোটের অংশ)
তালিকায় দশম স্থানে রয়েছে স্পেন। ২ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব নিয়ে তারা মূলত সামরিক পরিবহন বিমান এবং নৌ-যান রপ্তানিতে বিশেষ অবদান রাখছে। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তারা তাদের এই অবস্থান বজায় রেখেছে।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২১-২০২৫ সালের বৈশ্বিক অস্ত্র রপ্তানিচিত্র এটিই প্রমাণ করে যে, বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তির ভারসাম্য এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও মিত্র দেশগুলোর বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও, প্রথাগত শক্তি হিসেবে রাশিয়ার আবেদন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। অন্যদিকে, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো ইউরোপীয় দেশগুলো যেমন তাদের অবস্থান শক্ত করছে, তেমনি দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলোর দ্রুত উত্থান প্রমাণ করে যে-ভবিষ্যৎ অস্ত্র বাজার কেবল ঐতিহ্যের ওপর নয়, বরং ‘দ্রুত সরবরাহ’ এবং ‘সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির’ ওপর নির্ভরশীল হবে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যত বাড়বে, উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থার এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ততটাই তীব্রতর হবে।