২০২৫ সালে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গমনকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে সৌদি আরবই ছিল শীর্ষ গন্তব্য। সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখেরও বেশি মানুষ বিদেশে কাজ করতে গেছেন, যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সৌদি আরবকে বেছে নিয়েছেন।
বিএমইটি জানায়, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশে এক বছরে জনশক্তি পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস ও কাজ করছেন। প্রবাসী এই কর্মীরা প্রতি বছর দেশে ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। সত্তরের দশক থেকে সৌদি শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের প্রবেশ শুরু হয় এবং বর্তমানে দেশটিতে বাংলাদেশিরাই বৃহত্তম প্রবাসী জনগোষ্ঠী।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার হার বেড়েছে ১৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৬ লাখ ২৮ হাজার বাংলাদেশি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক আশরাফ হোসাইন বলেন, ‘গত বছর সাড়ে ৭ লাখের বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী সৌদি আরবে গেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরে সৌদি আরব বা অন্য কোনো দেশে এককভাবে এত বিপুল সংখ্যক কর্মী পাঠানোর নজির নেই।’
তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশে তাদের স্কিল ভেরিফিকেশন প্রোগ্রাম (দক্ষতা যাচাই কর্মসূচি) চালু করার পর এই উদ্যোগ আরও জোরদার হয়েছে। কর্মসূচিটির লক্ষ্য সৌদি শ্রমবাজারে কর্মরত শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা নিশ্চিত করা।
আশরাফ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য এখন নিরাপদ, দক্ষ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করা। সৌদি সংস্থা “তাকামোল”-এর অধীনে পরিচালিত দক্ষতা যাচাই কর্মসূচির আওতায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কর্মী সৌদি আরবে গেছেন।’
তিনি আরও জানান, দক্ষতা যাচাই প্রক্রিয়া সহজ করতে বাংলাদেশে সৌদি অনুমোদিত সার্টিফিকেশন সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
‘মাত্র তিন-চার মাস আগেও আমরা মাসে এক হাজার দক্ষ কর্মীকে সনদ দিতে পারতাম। বর্তমানে সারাদেশে ২৮টি সৌদি অনুমোদিত কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার কর্মীর দক্ষতা পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছি,’ বলেন তিনি।
এদিকে সৌদি আরবের খনি খাতেও দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে বিএমইটি খনি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে।
এ প্রসঙ্গে আশরাফ হোসাইন বলেন, ‘সৌদি আরব একটি তেলসমৃদ্ধ দেশ হওয়ায় সেখানে দক্ষ খনি শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা সৌদি শ্রমবাজারের জন্য বাস্তবভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কাজ করছি।’
উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি নতুন কর্মসংস্থান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে কর্মীদের সুরক্ষা, বেতন পরিশোধ, কল্যাণ ও স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ ও বড় প্রকল্পগুলোতে বাংলাদেশের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, ২০২৬ সালে এ প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৩ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


