শীতের আমেজে লালমনিরহাটের কৃষিজমিগুলো এখন কর্মচঞ্চল। জেলার পাঁচটি উপজেলায় শীতকালীন সবজি ও আগাম জাতের আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ক্ষেত থেকে নতুন আলু তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম থাকায় কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে।
জেলার বিভিন্ন কাঁচামাল আড়ত ও খুচরা বাজারে নতুন আলু উঠতে শুরু করেছে, কিন্তু পুরাতন আলুর প্রচুর সরবরাহের কারণে আগাম আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। পাইকারি বাজারে ‘ক্যারেজ’ জাতের আলু প্রতি ৫ কেজি ৯৫ টাকায় (কেজিপ্রতি ১৯ টাকা) এবং ‘হাগড়াই’ (বগুড়াই) জাতের আলু প্রতি ৫ কেজি ১৬০ টাকায় (কেজিপ্রতি ৩২ টাকা) বিক্রি হচ্ছে। এর তুলনায় হিমাগারে সংরক্ষিত পুরাতন লাল আলু প্রতি বস্তা (৬০ কেজি) বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০০ টাকায়, যা কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকার সমান।
খুচরা বাজারেও প্রভাব স্পষ্ট। শহরের সেনামৈত্রী হকার্স মার্কেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, হাড়িভাঙ্গা, বড়বাড়ী, মহেন্দ্রনগর ও বুড়ির বাজারে নতুন ‘ক্যারেজ’ আলু কেজিপ্রতি ২০-২২ টাকা এবং ‘হাগড়াই’ আলু ৩৫-৩৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পুরাতন লাল আলু পাওয়া যাচ্ছে ৮-১০ টাকা কেজিতে।
উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বাজারে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আদিতমারীর দুর্গাপুর ইউনিয়নের কৃষক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে নতুন আলুর পাইকারি দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা। এবার তা নেমে এসেছে ১৭-২০ টাকায়। উৎপাদন খরচই উঠছে না।’ কালীগঞ্জের তুষভান্ডার ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ন্যায্য দাম না পেলে প্রান্তিক কৃষকেরা সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।’
বাজারে দাম কমে যাওয়ার জন্য ব্যবসায়ীরা প্রধানত পুরাতন আলুর অতিরিক্ত সরবরাহকে দায়ী করছেন। বড়বাড়ী কাঁচামাল আড়তের পাইকার মজিদুল মিয়া বলেন, ‘পুরাতন আলু পর্যাপ্ত থাকায় নতুন আলুর চাহিদা কমেছে।’ এছাড়া তথ্যের ঘাটতি ও সঠিক বাজার সংযোগের অভাবও দামকে প্রভাবিত করছে।
কৃষকরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। হাতীবান্ধা উপজেলা কৃষক জাদ আলী ও সদর উপজেলার আলুচাষি আপেল উদ্দিন মনে করেন, রপ্তানি বৃদ্ধি, কার্যকর স্টক ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে আলুর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে লালমনিরহাটে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে চাষ সম্পন্ন হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩১০ হেক্টর বেশি। সদর উপজেলায় ৪ হাজার ১০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ৯৯০ হেক্টর, আদিতমারীতে ৮৮০ হেক্টর, হাতীবান্ধায় ৬৮০ হেক্টর, পাটগ্রামে ২৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এছাড়া আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে।
আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, আবহাওয়া সহায়ক থাকলে উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হতে পারে। তবে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার সোহায়েল আহমেদ স্বীকার করেছেন, হিমাগারে সংরক্ষিত পুরোনো আলুর কারণে নতুন আলুর বাজার কিছুটা চাপের মুখে আছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন আশা প্রকাশ করেছেন, বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবেন।


