কপালে এখন সত্যিই চিন্তার ভাঁজ ফেলছে কিডনি রোগ। এক সময় ধারণা ছিল কিডনির জটিলতা মূলত বয়স্কদের সমস্যা, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) এখন তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি না পান করা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের বিস্তার—সব মিলিয়ে কিডনি রোগ এক নীরব মহামারির রূপ নিচ্ছে। কিডনিতে পাথর, সংক্রমণ, পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ, এমনকি ফ্যাটি কিডনির মতো সমস্যাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাবই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কিডনি আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি রক্ত পরিশোধন করে শরীরের বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়, শরীরের তরল ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু কিডনি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে রোগটি নীরবে অগ্রসর হয়। যখন লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে—যেমন পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব—তখন অনেক ক্ষেত্রেই কিডনির বড় অংশ ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।
বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ রয়েছে, তাদের কিডনি ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। একইভাবে যারা ঘন ঘন মূত্রনালির সংক্রমণে ভোগেন বা দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেন, তাদের ক্ষেত্রেও কিডনি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই এসব ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। শুধু উপসর্গের অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগে পরীক্ষা করানোই হতে পারে বড় বিপদ এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সাধারণত কিডনির অবস্থা জানতে ‘কিডনি ফাংশন টেস্ট’ করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ক্রিয়েটিনিন হলো শরীরের পেশি ক্ষয়ের ফলে তৈরি হওয়া এক ধরনের বর্জ্য পদার্থ, যা সুস্থ কিডনি প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে গেলে তা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ০.৭ থেকে ১.৩ মিলিগ্রাম এবং নারীদের ক্ষেত্রে ০.৬ থেকে ১.১ মিলিগ্রাম। এর বেশি হলে তা কিডনি সমস্যার সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, কিডনি ফাংশন টেস্টের একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা সাধারণত তখনই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, যখন কিডনির প্রায় ৫০ শতাংশ কার্যক্ষমতা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ শুধু এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করলে কিডনির প্রাথমিক ক্ষতি অনেক সময় ধরা পড়ে না। তাই আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্ত করতে আরও সংবেদনশীল পরীক্ষার প্রয়োজন।
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ‘ইউরিন অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন রেশিও’ বা ইউরিন এসিআর। এটি একটি সহজ প্রস্রাব পরীক্ষা, যার মাধ্যমে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নামের প্রোটিনের উপস্থিতি এবং তার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সুস্থ কিডনি সাধারণত অ্যালবুমিন রক্তে ধরে রাখে এবং প্রস্রাবে যেতে দেয় না। কিন্তু কিডনির ছাঁকনি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেই অ্যালবুমিন প্রস্রাবে বের হতে শুরু করে। ফলে রক্তে ক্রিয়েটিনিন বাড়ার আগেই ইউরিন এসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির প্রাথমিক ক্ষতি শনাক্ত করা সম্ভব।
পরীক্ষায় যদি অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন অনুপাত ৩০-এর নিচে থাকে, তাহলে কিডনি স্বাভাবিক ধরা হয়। যদি এটি ৩০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকে, তাহলে সেটি কিডনি রোগের প্রাথমিক ধাপ, যাকে মাইক্রোঅ্যালবুমিনুরিয়া বলা হয়। এই পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে পারলে কিডনির ক্ষতি অনেকটাই রোধ করা যায়। আর যদি অনুপাত ৩০০-এর বেশি হয়, তাহলে তা গুরুতর কিডনি ক্ষতির লক্ষণ—এ অবস্থায় দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পানি পান, লবণ ও অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণে সংযম এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ইউরিন এসিআর পরীক্ষা করালে কিডনি রোগের ঝুঁকি অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের জটিলতা—এমনকি ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন—এড়াতে সহায়তা করতে পারে।


