হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনার জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলবাহী জাহাজের ভাড়া দ্রুত বাড়ছে, সামুদ্রিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং বীমা খরচও লাফিয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে।
তেল পরিবহন ভাড়া কয়েকগুণ বৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজমালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
শিপব্রোকারদের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার সিনোকর মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে খুব বড় আকারের ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্কারে (VLCC) তেল পরিবহনের জন্য প্রায় ৭০০ ওয়ার্ল্ডস্কেল পয়েন্ট ভাড়া চাইছে। এতে পূর্ব চীনে প্রতি ব্যারেল তেল পরিবহন খরচ প্রায় ২০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে গত বছর গড় খরচ ছিল প্রায় ২.৫০ ডলার।
ব্লুমবার্গ জানায়, গ্রিসভিত্তিক ডাইনাকম ট্যাঙ্কার্স ম্যানেজমেন্টের নিয়ন্ত্রিত একটি ট্যাঙ্কার ৫২৫ ওয়ার্ল্ডস্কেলে অস্থায়ীভাবে ভাড়া হয়েছে। এতে দৈনিক আয় প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়।
নোঙর করে আছে শতাধিক ট্যাঙ্কার
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর অন্তত ১৫০টি তেল ও এলএনজি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালীর বাইরে উপসাগরীয় জলসীমায় নোঙর করে আছে। আরও অনেক জাহাজ প্রণালীর অপর প্রান্তে স্থির অবস্থায় রয়েছে। অনেক জাহাজ ইউএই ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী-নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। তবে নাবিকদের বাড়তি নৌ উপস্থিতি, নিরাপত্তা সতর্কতা, রেডিও যোগাযোগ বৃদ্ধি, নোঙর এলাকায় জট এবং বীমা বাজারে অস্থিরতার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
যুদ্ধঝুঁকি বীমায় প্রিমিয়াম বৃদ্ধি
বীমা খাতেও দ্রুত প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধঝুঁকি বীমাদাতারা উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বাতিলের নোটিশ জমা দিয়েছেন। ব্রোকারদের মতে, প্রিমিয়াম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
মার্শের তথ্য অনুযায়ী, আগে উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বীমা খরচ ছিল জাহাজের পুনঃস্থাপন মূল্যের প্রায় ০.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি জাহাজের জন্য প্রতি ভ্রমণে খরচ হতো প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে তা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার ডলার।
বীমা বিশ্লেষকদের মতে, চলমান হামলা অব্যাহত থাকলে জাহাজ আটক বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে। ফলে আন্ডাররাইটাররা প্রিমিয়াম নির্ধারণে অতিরিক্ত ঝুঁকি যোগ করছেন।
ইউএইর জন্য বহুমুখী ঝুঁকি
ইউএই ওপেকের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক। দেশটির অধিকাংশ তেল রপ্তানি হরমুজ প্রণালী নির্ভর। তবে আবুধাবির তেলক্ষেত্র থেকে ফুজাইরাহ বন্দরে ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের মাধ্যমে, যা প্রণালীর বাইরে অবস্থিত। তবুও ইরাক, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোর অধিকাংশ রপ্তানি এই প্রণালী দিয়েই যায়।
ইউএই আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। জেবেল আলি ও খোর ফাক্কান বন্দর এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে পণ্য পরিবহনের বড় ট্রানশিপমেন্ট হাব। সামুদ্রিক অস্থিরতা কনটেইনার পরিবহনেও প্রভাব ফেলছে।
মায়ের্স্ক, হাপাগ-লয়েড, সিএমএ সিজিএম ও এমএসসি’র মতো বড় শিপিং কোম্পানিগুলো হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত বা বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যগামী ও সেখান থেকে আসা পণ্য পরিবহনে বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয় বাড়বে।
জ্বালানি ও বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী কয়েকদিনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ হলেও তেলের দাম ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেলের উপরে উঠতে পারে। যদিও পূর্ণ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন হামলাও বাজারে ভীতি তৈরি করতে যথেষ্ট।
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বৈশ্বিক অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানির প্রায় ১৫ শতাংশ এবং সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে যুক্ত। দুবাইয়ের আল খালিজ সুগার রিফাইনারি বিশ্ব চিনি উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ পরিচালনা করে। এসব পণ্যের বড় অংশ হরমুজ হয়ে পরিবাহিত হয়।
বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি
দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা হলে তেলের দাম, পরিবহন ভাড়া এবং বীমা প্রিমিয়াম আরও বাড়বে। এতে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউএইর বন্দর, পাইপলাইন ও বাণিজ্যপথ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধির এই সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখন আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান উদ্বেগ।


