ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি দ্রুত আইনে পরিণত করা সময়ের দাবী

সৈয়দা অনন্যা রহমান
ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬ ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ । ১০০ জন

তামাক শুধু স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে না, পরিবেশ এবং অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। “Tobacco Atlas” ২০২৫-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের কারণে প্রায় ১৯৯,১৪৯ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাকের কারণে অর্থনৈতিক ও এবং পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও অধিক। তামাকের বহুমাত্রিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’অনুমোদন করেছে । অনুমোদনকৃত অধ্যাদেশটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষায় অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

নতুন অধ্যাদেশটিতে উল্লেখযোগ্য কোন কোন বিষয়গুলো রয়েছে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক- ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’এর সংজ্ঞায়, ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টস যেমন: ই-সিগারেট (e-cigarette) বা ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ENDS), হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট (HTP), নিকোটিন পাউচ ইত্যাদি যুক্ত করা হয়েছে। পাবলিক প্লেসের সংজ্ঞায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার ভবন, প্ল্যাটফর্ম, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, খাবার দোকান, কফি হাউজ ইত্যাদি অন্তভুক্ত করা হয়েছে। পাবলিক পরিবহনের সংজ্ঞায় যান্ত্রিক জনযানবাহনের পাশাপাশি অযান্ত্রিক অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপানের পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান/এলাকা রাখার বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে।

অধ্যাদেশে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ‘স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং’। যেখানে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কের আকার (shape), আয়তন (size), উপাদান, মোড়কজাতকরণ এবং মোড়কে তামাকজাত দ্রব্যের পরিমাণ ও সংখ্যা সংক্রান্ত প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তামাকজাত দ্রব্যের সকল ধরণের প্যাকেট, মোড়ক, কার্টন, বস্তা ও কৌটায় অন্যূন শতকরা ৭৫ (পঁচাত্তর) ভাগ স্থানে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মূদ্রণের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

কোনো সিনেমা, নাটক বা প্রামাণ্য চিত্রে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপস, মঞ্চ অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো গণমাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম ও তামাকজাত দ্রব্য বা দ্রব্যের মোড়ক প্রচার, প্রদর্শন বা বর্ণনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়স্থলে (point of sales) যে কোনো উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার এবং তামাকজাত দ্রব্যের কোনো ধরণের প্যাকেট, কৌটা, খালি বা নমুনা মোড়ক প্রদর্শন নিষিদ্ধি করা হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশু পার্কের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যা তরুণদের তামাকের নেশা থেকে সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম, ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টস ইত্যাদি নিষিদ্ধ। এর উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, প্রচার-প্রচারণা, প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা, বিপণন, বিতরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অধ্যাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের সাথে কোনো ক্ষতিকর আসক্তিমূলক দ্রব্য অথবা কোনো মিশ্রণ যুক্ত করার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

জনস্বার্থে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যে কোন কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্যই জরুরী। তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ সহজ এবং সাশ্রয়ী এবং এতে প্রাণহানি, আর্থিক চাপ ও জটিলতা কমে, কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনে। সেকারণেরই তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহায়ক। উল্লেখিত অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত সংসদে উপস্থাপনের মাধ্যমে এটিকে আইনে পরিনত করা জরুরী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ (১) ও (২) অনুসারে- জারিকৃত অধ্যাদেশটি সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপনপূর্বক আইন আকারে অনুমোদন গ্রহণ প্রয়োজন।

আশার কথা ইতিমধ্যেই নির্বাচিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহারে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ তথা তামাক নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। উল্লেখ্য ২০০৫ সালে বিএনপি জোট সরকারের সময়কালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনটি প্রণয়ন করা হয়। যা বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এ মূহূর্তে প্রত্যাশা, নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ জনগনের কাছে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’কে আইন হিসেবে পাসে আন্তরিক সহযোগিতা ও সমর্থন প্রদান করবেন। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

লেখক: সৈয়দা অনন্যা রহমান, বিভাগীয় প্রধান (তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট