ঢাকারবিবার , ১২ অক্টোবর ২০২৫
  • অন্যান্য

জলবায়ু ঝুঁকিতে বিপর্যস্ত দক্ষিণ এশিয়া

২০৩০ সালের মধ্যে বিপজ্জনক তাপের মুখে ৯০% মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১২, ২০২৫ ৩:৪২ অপরাহ্ণ । ২৮০ জন

জলবায়ু পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের অন্যতম বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন “ঝুঁকি থেকে স্থিতিস্থাপকতা” অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বিপজ্জনক তাপের মুখোমুখি হতে পারে এবং প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হবে। সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় স্থিতিস্থাপকতা গঠনে এখন বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

জলবায়ুর রূপ বদলাচ্ছে
বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত, হিমালয়ের হিমবাহ এবং বিশাল নদী ব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুকে সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব ও দারিদ্র্য এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির ব-দ্বীপ এলাকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অপরদিকে হিমবাহ গলে যাওয়ায় জল সুরক্ষা মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে।

জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব
চরম তাপমাত্রা কৃষি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং বাইরের কাজকে অনিরাপদ করে তুলছে। বন্যা ও ঝড় ধ্বংস করছে ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও বহু বছরের অর্জিত উন্নয়ন। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে পড়ছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে এই দক্ষিণ এশিয়াই।

চরম আবহাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় থেকে শুরু করে পাকিস্তানে খরা-সবই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে স্পষ্ট করে তুলছে। ২০২২ সালে মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের কারণে তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা ৩০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। অপ্রত্যাশিত বর্ষা ফসলের ক্ষতি করছে, আর শক্তিশালী ঝড় বৈষম্য ও অস্থিতিশীলতাকে আরও গভীর করছে।

জলবায়ু-স্মার্ট উন্নয়নের সম্ভাবনা
ঝুঁকির মাঝেও দক্ষিণ এশিয়া জলবায়ু-স্মার্ট উন্নয়নের মাধ্যমে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ কর্মসংস্থান, জলবায়ু অভিযোজিত কৃষি ও টেকসই অবকাঠামো এই পথকে মজবুত করবে। ভারতের আহমেদাবাদের তাপ কর্ম পরিকল্পনা-শীতল ছাদ, প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা-একটি সফল অভিযোজন উদাহরণ।

আর্থিক স্থিতিস্থাপকতার গুরুত্ব
বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় অভিযোজনের জন্য প্রতিবছর আঞ্চলিক জিডিপির ২ শতাংশেরও বেশি ব্যয় হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিপর্যয় বন্ড, প্যারামেট্রিক বীমা এবং ডিজিটাল মডেল সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। ভারতের ফসল বীমা কর্মসূচি এই ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত।

নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু অভিযোজনকে প্রশমনের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি কমায় না, সামাজিক স্থিতিশীলতাও জোরদার করে।

ঝুঁকি থেকে স্থিতিস্থাপকতায় যাত্রা
দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি। ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এখনকার সম্মিলিত পদক্ষেপের ওপর। আর্থিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও কার্যকর নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি থেকে স্থিতিস্থাপকতায় রূপান্তরই পারে এই অঞ্চলের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।