পাহাড় থেকে সমতল-যেদিকেই চোখ যায়, হাওয়ায় দুলছে শিমের সবুজ লতা আর বেগুনি রঙের ফুল। শীতকালীন এই সবজির ব্যাপক চাষের কারণে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলাকে বলা হয় ‘শিমের রাজ্য’। এ বছর শিমের বাম্পার ফলনে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের আশা, চলতি মৌসুমে এখান থেকে ১০০ কোটির বেশি টাকার শিম বিক্রি হবে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডে উৎপাদিত শিম শুধু দেশের চাহিদা পূরণই করছে না, ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হচ্ছে। ন্যায্য দাম ও ভালো ফলন পাওয়ায় খুশি শিমচাষিরা। উপজেলায় বর্তমানে সাত প্রজাতির শিমের চাষ হচ্ছে। এগুলো হলো-কার্তিকোটা, কার্তিকবাটা, বাটা, পুঁটি, ছুরি, লইট্টা ও রূপবান। এর মধ্যে রূপবান গ্রীষ্মকালীন এবং ছুরি শিমের ফলন হয় সারা বছর। অন্য প্রজাতিগুলো মূলত শীত মৌসুমে উৎপাদিত হয়।
বাঁশবাড়িয়া, সৈয়দপুর, পৌর সদর, মুরাদপুর, বারৈয়াঢালা, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও শীতলপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে-যতদূর চোখ যায় শুধু শিমের ক্ষেত। কৃষকরা জানান, সীতাকুণ্ডের শিম স্বাদে ও গুণে অতুলনীয়। এখানকার পাইকাররা শিম ও শিমের বিচি পৃথকভাবে সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করছেন। এতে একদিকে কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে।
বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের টেরিয়াইল গ্রামের কৃষক মো. মানিক জানান, তিনি ৯০ শতাংশ জমিতে কার্তিকোটা শিম চাষ করেছেন। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। গত এক মাসে তিনি প্রায় দুই লাখ টাকার শিম বিক্রি করেছেন। সামনে আরও লক্ষাধিক টাকার শিম বিক্রির আশা করছেন।
পৌরসভার নুনাছড়া এলাকার কৃষক নুর নবী বলেন, তিনি প্রায় ১৫০ শতক জমিতে শিম চাষ করেছেন। এতে খরচ হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার টাকা। অগ্রিম চাষ করায় নভেম্বর থেকেই শিম বিক্রি শুরু করেন। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি শিম ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার শিম বিক্রি করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুমিরা ইউনিয়নের রেলওয়ের পুরোনো টিবি হাসপাতাল এলাকা থেকে পূর্বদিকে তিনটি পাহাড়ের ঢালু অংশজুড়ে শিমের চাষ হয়েছে। সীতাকুণ্ড পৌর সদরের চৌধুরীপাড়া ও হাসান গোমস্তা-সংলগ্ন এলাকাতেও ব্যাপকভাবে রূপবান শিমের চাষ হচ্ছে। পাহাড়ের ঢালু জমিতে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মাচা তৈরি করে প্রতিটি খুঁটির গোড়ায় তিনটি করে শিমগাছ লাগানো হয়েছে। কোথাও কৃষক শিম তুলছেন, আবার একই সঙ্গে নতুন ফুল ফুটছে।
বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা পিপাস কান্তি চৌধুরী জানান, উপজেলায় পাঁচ হাজারের বেশি কৃষক শিম চাষের সঙ্গে জড়িত। নুনাছড়া থেকে ফকিরহাট পর্যন্ত এলাকায় সর্বাধিক শিম উৎপাদন হয়। পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চল ও ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ হাজার টন শিম উৎপাদিত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবীবুল্লা বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে শিমচাষিদের সার, বীজ, কারিগরি পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। চলতি শীত মৌসুমে উপজেলায় ২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার টন শিম। গত মৌসুমে ৮৫ থেকে ৯০ কোটি টাকার শিম বিক্রি হলেও এবার তা ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।


