ঢাকাবুধবার , ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

সামাজিক-ধর্মীয় সহিংসতায় বাংলাদেশ ‘অত্যন্ত উচ্চ’ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৭ সকাল

Link Copied!

বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত পর্যায়ে ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষ, হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে সরকারি বিধিনিষেধ তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় শত্রুতার হার ২০২৩ সালে রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর ১৬তম বার্ষিক বিশ্ব ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির ‘পিউ-টেম্পলটন গ্লোবাল রিলিজিয়াস ফিউচার’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে মোট ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি :

পিউ রিসার্চের গবেষণায় বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় শত্রুতার বিচারে বাংলাদেশকে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ‘উচ্চ’ ক্যাটাগরিতে ছিল, যেখানে ১০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬.১। তবে ২০২৩ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্কোর ১.৭ পয়েন্ট লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৭.৮-এ। দেশে একাধিক মব ভায়োলেন্সের (গণসহিংসতা) কারণেই মূল সূচকে এই অবক্ষয় ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ধর্মীয় শত্রুতা বৃদ্ধির পেছনে ২০২৩ সালের মূলত দুটি নির্দিষ্ট সহিংসতার তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের ৩ ও ৪ মার্চ পঞ্চগড় জেলার আহমদনগর গ্রামে, যেখানে আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বার্ষিক সালানা জলসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি গোষ্ঠী হামলা চালায়। এই হামলায় দুইজন নিহত হন এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হন। এছাড়া আহমদীয়া সম্প্রদায়ের বহু বসতবাড়ি, তাদের একটি উপাসনালয় এবং একটি ফ্রি মেডিকেল ক্লিনিক ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে একই বছরের শুরুর দিকে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। সেখানে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর ফেসবুক পোস্টের অভিযোগ তুলে এক হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তির বসতবাড়িতে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও মব ভায়োলেন্স বাংলাদেশে ধর্মীয় সামাজিক শত্রুতার মাত্রা একলাফে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

সামাজিক শত্রুতা বৃদ্ধির নতুন রেকর্ড :

পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বের ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে অন্তত ৫৫টি দেশে ধর্মীয় বিষয়ে উচ্চ বা অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার সামাজিক শত্রুতা দেখা গেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৪৫টি দেশ। সংস্থাটি মূল মূল্যায়ন দুটি পৃথক সূচকের মাধ্যমে প্রকাশ করে—’সোশ্যাল হোস্টেলিটিজ ইনডেক্স’ (সামাজিক শত্রুতা সূচক) এবং ‘গভর্নমেন্ট রেস্ট্রিকশনস ইনডেক্স’ (সরকারি বিধিনিষেধ সূচক)।

সামাজিক শত্রুতা সূচক-এ ২০২৩ সালে মোট ১৩৯টি দেশে পয়েন্টের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে ৮৮টি দেশে ধর্মীয় শত্রুতা বেড়েছে এবং ৫১টি দেশে কমেছে। পিউ রিসার্চের ১৬ বছরের গবেষণার ইতিহাসে এক বছরে মাত্র ৫১টি দেশে শত্রুতা কমা হলো সর্বনিম্ন হ্রাসের রেকর্ড, যা প্রমাণ করে যে বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা দ্রুত ছড়াচ্ছে। বাকি ৫৯টি দেশের পয়েন্ট অপরিবর্তিত ছিল।

বিশ্বের যে ৬টি দেশে ২০২৩ সালে ধর্মীয় সামাজিক শত্রুতার মাত্রা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ (৭.২ বা তার বেশি) ছিল, সেগুলো হলো—নাইজেরিয়া, ভারত, ই/স/রায়েল, সিরিয়া, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান। এর প্রতিটি দেশেরই শত্রুতা সূচক স্কোর ছিল অন্তত ৭.৫ বা তার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও ইসরায়েল ‘উচ্চ’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও ২০২৩ সালে তা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ ক্যাটাগরিতে উঠে আসে।

ই/স/রায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ :

বাংলাদেশ ছাড়া বৈশ্বিক তালিকায় বড় ধরণের অবনতি দেখা গেছে ই/স/রায়েলে। ২০২২ সালে ইসরায়েলের স্কোর ছিল ৭.১, যা ২০২৩ সালে একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৮.৪-এ। পিউ রিসার্চের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা থেকে হা/মা/স যোদ্ধাদের ইসরায়েলি ভূখণ্ডে পরিচালিত আকস্মিক হামলার কারণেই মূল সূচকে এই পরিবর্তন এসেছে। গবেষণার নীতি অনুযায়ী, কোনো সশস্ত্র ধর্মীয় গোষ্ঠী (সংগঠন) দ্বারা সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা যে দেশে ঘটে, সেই দেশের সামাজিক শত্রুতা সূচকে তা গণনা করা হয়।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে সামাজিক শত্রুতার সূচকে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আফগানিস্তান, মিশর ও ইরাকে সামাজিক শত্রুতার হার আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ থেকে ‘উচ্চ’ ক্যাটাগরিতে নেমে এসেছে। আফগানিস্তানের স্কোর ৭.৩ থেকে কমে ৭.০, মিশরের স্কোর ৭.৪ থেকে কমে ৭.১ এবং ইরাকের স্কোর ১.০ পয়েন্ট কমে ৭.৮ থেকে ৬.৮-এ নেমে দাঁড়ায়।

সরকারি বিধিনিষেধের হালচাল :

সামাজিক শত্রুতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হলেও বিশ্বজুড়ে ধর্মের ওপর সরকারি বা আইনি কড়াকড়ির হার বিগত বছরের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বের ৫৮টি দেশ ও অঞ্চলে সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা ছিল ‘উচ্চ’ বা ‘অত্যন্ত উচ্চ’, যা ২০২২ সালে ছিল ৫৯টি দেশ।

সরকারি আইন, নীতিমালা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের ২৫টি দেশে পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত উচ্চ’ (৬.৬ থেকে ১০.০) পর্যায়ে ছিল। এই তালিকায় শীর্ষে থাকা উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো চীন, ইরান, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সিরিয়া এবং উজবেকিস্তান।

সার্বিক বিশ্লেষণ ও গবেষণা পদ্ধতি :

পিউ রিসার্চ সেন্টার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন—মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ফ্রিডম হাউসের সার্বজনীন তথ্য ও প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে এই সূচকগুলো তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ দেশ ও অঞ্চলেই এখনো ধর্মীয় শত্রুতা বা সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা নিম্ন (অল্প) থেকে মাঝারি পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে, কিন্তু যেখানেই জনবহুল অঞ্চল বা রাজনৈতিক অস্থিরতা রয়েছে, সেখানেই এই শত্রুতা তীব্র আকার ধারণ করছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ধর্মীয় পোশাক বা আচার নিয়ে হয়রানি এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যর্থতা বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ বাড়ছে, চলতি বছর মৃত্যু ৪

শেরপুরে পাট কাটার ধুম, ৪০ কোটি টাকার ফলনের প্রত্যাশা

সন্ধ্যার মধ্যে চার অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

আড়াই লাখ কোটি টাকায় তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন

লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৬৮ বাংলাদেশি

২০৩০ সালের মধ্যে ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করবে পিডিবি

সিলেটের পর্যটন-চা ও শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

দেশের ৫ বিভাগে ভারী বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা

খিলক্ষেতে ট্রেনের ধাক্কায় অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যু

চাঁদপুরে ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২

চিরিরবন্দরে ধানখেতে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু