ঢাকাশনিবার , ৩০ মে ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

ভিলনিয়াস: ইউরোপের সবুজ রাজধানী এবং টেকসই নগরের গল্প

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৪:৩২ অপরাহ্ণ

Link Copied!

এক সকালে ভিলনিয়াস শহরের কেন্দ্রস্থলে ঘুরতে বের হলে শহরের রাস্তাঘাটে চলাচলরত মানুষ, সবুজ পার্ক, এবং সাইকেল চালিয়ে অফিসগামীদের চিত্র এক অদ্ভুত মিলন তৈরি করে। শহরটি যেন এক জীবন্ত উদাহরণ, যেখানে আধুনিক নগর জীবন এবং প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে। ভিলনিয়াসকে ২০২৫ সালের ইউরোপিয়ান গ্রিন ক্যাপিটাল হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে—এই নির্বাচনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে, যা শহরের পরিকল্পনা, প্রশাসন, নাগরিক সচেতনতা এবং টেকসই উদ্যোগকে তুলে ধরে।

ভিলনিয়াসের এই সাফল্য কোনদিন হঠাৎ হয়ে আসেনি। শহরটি ধীরে ধীরে একটি টেকসই নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রাচীন শহর হিসেবেই ভিলনিয়াসের ইতিহাস সমৃদ্ধ, তবে আধুনিক সময়ের চ্যালেঞ্জ—দূষণ, যানজট, জলবায়ু পরিবর্তন—এর সমাধানের জন্য শহর প্রশাসন এবং নাগরিকরা একসঙ্গে কাজ করেছে। প্রথমেই শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নির্ভরতা কমানোর জন্য শহরটি সম্প্রসারিত করেছে গণপরিবহন নেটওয়ার্ক। বাস, ট্রাম এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন চালু করে শহরটিকে দ্রুত, পরিচ্ছন্ন এবং কার্যকরী করা হয়েছে। সাইকেল চর্চার জন্য বিশেষ লেন এবং পার্কিং সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। এখন শহরের অধিকাংশ মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য সাইকেল বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে।

শহরের সবুজ এলাকা অন্যান্য ইউরোপীয় শহরের তুলনায় অসাধারণ। ভিলনিয়াসের বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত উদ্যান, বনভূমি, খোলা সবুজ মাঠ এবং নদী সংলগ্ন পার্ক রয়েছে। এসব এলাকায় শুধু গাছপালা নয়, স্থানীয় পশুপাখি ও প্রাণীর বাসস্থানও সংরক্ষিত। নাগরিকরা পার্কে হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম, পিকনিক করে, যা শহরের জীবনকে আরামদায়ক ও সুস্থ রাখে। নগরায়নের ফলে সবুজের হার কমে যাওয়া সাধারণ, কিন্তু ভিলনিয়াসের পরিকল্পনায় সবুজ এলাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরটিকে প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে।

শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার। ভিলনিয়াস সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। শহরের বেশিরভাগ সরকারি ও বেসরকারি ভবন শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে তৈরি। সৌর প্যানেল এবং হিটিং সিস্টেম ব্যবহার করে শক্তি কমানো হচ্ছে, যা কার্বন নির্গমন হ্রাসে কার্যকর। এভাবে শহর পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই হয়ে উঠেছে।

শহরের পরিকল্পনা কেবল ভবন ও রাস্তার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকদের অংশগ্রহণ শহরের টেকসই উদ্যোগকে শক্তিশালী করেছে। প্রতিটি পরিবার বর্জ্য আলাদা করার নিয়ম মেনে চলে—প্লাস্টিক, কাগজ, গ্লাস এবং জৈব বর্জ্য আলাদা করা হয়। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালানো হয়। ফলে নাগরিকদের মধ্যে পরিবেশ-বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

ভিলনিয়াস শহরের জলবায়ু উদ্যোগগুলোও প্রশংসনীয়। শহরে বৃষ্টির জল পুনঃব্যবহার, নদীর পানি পরিষ্কার রাখা, এবং পানির অপচয় রোধ করা হয়েছে। শহরের নদী ও জলাধারগুলো এত পরিষ্কার যে, নাগরিকরা সেখান থেকে মাছ ধরতে বা নদীতে হাঁটাহাঁটি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শহরের জলাধারগুলো এখনো কার্যকরভাবে সংরক্ষিত, যা টেকসই নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

শহরের নীতি-প্রণয়ন ও প্রশাসনিক কাঠামোও সবুজ উন্নয়নের দিকে মনোযোগী। সরকার পরিবেশ বান্ধব নীতি প্রণয়ন করেছে এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করছে। শহরের পরিকল্পনাকারীরা সবুজ এলাকা, নবায়নযোগ্য শক্তি, এবং পরিবেশ-সচেতন যানবাহনের দিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নগরায়নের প্রতিটি ধাপেই পরিবেশ সংরক্ষণের কথা বিবেচনা করা হয়।

তুলনামূলকভাবে অন্যান্য ইউরোপীয় সবুজ শহর যেমন কপেনহেগেন বা ওসলো-এর সঙ্গে ভিলনিয়াসকে দেখলে বোঝা যায়, এটি শুধু সৌন্দর্য বা সবুজ এলাকা নয়, বরং শহরের প্রশাসন, নাগরিক অংশগ্রহণ, এবং টেকসই নীতি মিলিয়ে একটিমাত্র উদাহরণ। কপেনহেগেনে CO₂ কমানো, সাইক্লিং বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ওসলোতে নগরের ৭৪% অংশ সবুজ, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং EV ব্যবহার আছে। কিন্তু ভিলনিয়াসের বৈশিষ্ট্য হলো এই সব উদ্যোগ মিলিয়ে শহরকে একটি জীবনমুখী সবুজ নগরীতে পরিণত করা।

শহরের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিবেশ-বিষয়ক কোর্স এবং গবেষণার সুযোগ আছে। নতুন প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা শহরের সবুজ নীতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বড় হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের নাগরিকরাও পরিবেশ বান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।

ভিলনিয়াসের এই সবুজ অভিযানের ফলে শহরের বায়ুর মান উন্নত হয়েছে, দূষণ কমেছে, এবং নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্যও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। প্রতিটি পার্ক, নদী তীর, এবং সবুজ ছাদ শহরের মানুষের জন্য বিশ্রাম ও বিনোদনের স্থান। সবুজ এলাকা শহরের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করছে, গরমে শীতলতা, বৃষ্টিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বাতাসকে পরিশোধিত রাখছে।

শহরের টেকসই উদ্যোগ শুধুমাত্র ভিলনিয়াসের নাগরিকদের জন্য নয়, বরং সমগ্র ইউরোপ এবং বিশ্বের জন্য উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে নগরায়ন মানেই পরিবেশের ক্ষতি নয়। সঠিক নীতি, নাগরিক সচেতনতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার মিলিয়ে শহরকে টেকসই এবং বাসযোগ্য রাখা সম্ভব।

উপসংহারে বলা যায়, ভিলনিয়াস শহরের গল্প আমাদের শেখায় যে, আধুনিক নগর জীবন এবং প্রকৃতি একে অপরের বিপরীতে নয়, বরং সহাবস্থানের মাধ্যমে উন্নয়ন সম্ভব। শহরের প্রশাসন, নাগরিক সচেতনতা, সবুজ এলাকা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার মিলিয়ে এটিকে ইউরোপের সবুজ রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলেছে। এমন উদাহরণ থেকে অন্যান্য শহর শিখতে পারবে যে, পরিবেশ বান্ধব নগর পরিকল্পনা কেবল সঠিক উদ্যোগ নয়, এটি জীবনযাত্রার অংশ হওয়া উচিত।

ভিলনিয়াসের এই অর্জন কেবল পুরস্কার নয়, বরং একটি বার্তা যে পৃথিবীর শহরগুলোকে সবুজ এবং টেকসই করা সম্ভব, যদি নাগরিক, প্রশাসন এবং প্রযুক্তি একসাথে কাজ করে। ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় ভিলনিয়াসের অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী টেকসই শহরের মডেল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

লঘুচাপের প্রভাবে ৫ দিনজুড়ে বৃষ্টি-ঝড়ের আভাস

রবি এলিট প্রোগ্রামে আরও ১৬ ব্র্যান্ড, মিলবে ৫২% পর্যন্ত ছাড়

With 16 New Brands, Robi Elite Offers Up To 52% Discount

অপো এ সিরিজকে নম্বর ১ স্মুথনেস, ব্যাটারি লাইফ ও ডিউরেবিলিটির স্বীকৃতি দিলো বুয়েট

Universal Birth-Death Registration Accelerates SDGs

শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এসডিজি অর্জনে সহায়ক

ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ‘ভূমি দৃষ্টি’ অ্যাপ চালু হচ্ছে: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

প্রকৃতি ও জীব-বৈচিত্র্য বেঁচে থাকলে আমরাও বাঁচব- জীব-বৈচিত্র্য দিবসে বক্তারা

Apex Footwear introduces ‘Buy Online, Pick-up in Store’ (BOPIS) service ahead of Eid ul-Azha

ঈদে ক্রেতাদের সুবিধায় ‘এক্সপ্রেস ডেলিভারি’ ও ‘পিকআপ’ সেবা চালু করল এপেক্স

Recommendation to ban unfit Motor vehicles for safe Eid travel

নিরাপদ ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধের সুপারিশ