ঢাকামঙ্গলবার , ৬ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

নেপালে প্রলয়ঙ্কারী ভূমিধস: বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কি এর জন্য দায়ী?

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ সকাল

Link Copied!

নেপাল-চীন সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী ও আকস্মিক হিমবাহ ধস, বরফ-পাথরের পতন এবং এর ফলে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্কারী কাদা ধসের ঘটনা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। গত ২৬ আগস্ট সংঘটিত এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলের সংবেদনশীল ভূ-প্রকৃতির এক ভয়াবহ রূপ।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিজিটিএন-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই বিপর্যয়ের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রত্যক্ষ প্রভাব, হিমবাহের দ্রুত গলন এবং এর বৈজ্ঞানিক কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে :
গত ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে নেপালের লাংতাং উপত্যকার ল্যাংতাং লিরুং পর্বতের উচ্চ ঢালে আকস্মিক বিশাল এক হিমবাহ ভেঙে পড়ে। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে খসে পড়া এই বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করে এবং প্রায় ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চীন সীমান্তবর্তী গ্যালুং ও গিয়িরং পোর্ট এলাকায় আছড়ে পড়ে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ধসের ফলে যে ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল তা ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান শক্তির সমতুল্য ছিল। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় শূন্য দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং সেখানে একটি বিপজ্জনক প্রমাদ হ্রদ তৈরি হয়। এই আকস্মিক দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার উদ্ধারকাজ এখনো অত্যন্ত দুর্গম পরিস্থিতিতে চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও হিমালয়ের বরফ গলন :
চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেস (সিএএস)-এর অধীন মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (আইএমএইচই)-এর মহাপরিচালক কাং শিচাংয়ের মতে, এই বিপর্যয়ের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। গত ছয় দশকের বেশি সময় ধরে চীনের চিংহাই-তিব্বত মালভূমি এবং হিমালয় অঞ্চলে পরিচালিত তিনটি জাতীয় হিমবাহ জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো আশঙ্কাজনক হারে সংকুচিত হচ্ছে।

প্রথম জরিপে যেখানে তিব্বত মালভূমির হিমবাহের ক্ষেত্রফল ছিল প্রায় ৬১ হাজার বর্গকিলোমিটার, দ্বিতীয় জরিপে তা কমে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারে এবং সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী তা আরও কমে প্রায় ৩৯ হাজার বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত ৬০ বছরে এই অঞ্চলের প্রায় ২৪ শতাংশ বা প্রায় এক-চতুর্থাংশ হিমবাহ পুরোপুরি গলে হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে তিব্বত মালভূমির দক্ষিণ অংশ, গানতিসে পর্বতমালা, নিয়েনচেন তাংলা এবং হিমালয় অঞ্চলে এই বরফ গলনের হার সবচেয়ে বেশি।

বিশ্ব জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ জানাচ্ছে, ১৯৯০-এর দশক থেকেই বিশ্বজুড়ে হিমবাহ গলে যাওয়ার গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বিশ্বের প্রতিনিধিস্থানীয় হিমবাহগুলো প্রতি বছর গড়ে ১.১ মিটারেরও বেশি তার উচ্চতা বা ভর হারিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি)-এর বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহের এই দ্রুত পশ্চাদপসরণ এবং পারমাফ্রোস্ট বা চিরহিমায়িত মাটির গলন ঢালের স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।

হিমবাহ হ্রদের সম্প্রসারণ ও শৃঙ্খলিত দুর্যোগ :
হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার একটি সরাসরি এবং বিপজ্জনক পরিণতি হলো হিমবাহ হ্রদের অস্বাভাবিক বিস্তার। আইএমএইচই-এর গবেষক নি ইওংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চিংহাই-তিব্বত মালভূমিতে ১৪ হাজারেরও বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যা ১ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বিশেষ করে চীনের দক্ষিণ সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে এই হ্রদগুলো প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ হারে বড় হচ্ছে।

এদিকে বিজ্ঞানীরা একে কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগগুলো সাধারণত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যাকে ‘ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ড’ বা শৃঙ্খলিত দুর্যোগ বলা হয়। হিমবাহের হঠাৎ ভাঙন, বরফ বা পাথরের ধস এবং হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক ফেটে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো একত্রে একটি চেইন রিঅ্যাকশন (শৃঙ্খল প্রক্রিয়া) তৈরি করে। বর্তমানে একা হিমালয় অঞ্চলেই একশটিরও বেশি হিমবাহ হ্রদকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঘটনায় নেপালের অংশে হিমবাহ ধসের পর নদীর গতিপথ আটকে যে বাধা হ্রদ তৈরি হয়েছিল, তা যদি কোনো কারণে ভেঙে যায় তবে তা আরও বড় ধরনের মাধ্যমিক বা সেকেন্ডারি দুর্যোগের জন্ম দিতে পারে। পাহাড়ি সংকীর্ণ উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এই ধ্বংসাত্মক উপাদানগুলোর গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৫০ মিটারেরও (ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটারের বেশি) বেশি হয়ে থাকে, যা এর ধ্বংসলীলাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও বৈশ্বিক উদ্বেগের ক্ষেত্র :
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, তুষার ও বরফ-সংক্রান্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো— এগুলোর প্রতিক্রিয়া তাপমাত্রা পরিবর্তনের ১০ থেকে ২০ বছর পরে দৃশ্যমান হতে পারে। এর অর্থ- বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাব এখনও হিমবাহের ওপর পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি এবং আগামী দিনগুলোতে পাহাড়ি অঞ্চলের এই অস্থিরতা আরও তীব্রতর হতে পারে। ইউরোপীয় আল্পস পর্বতমালা, আন্দিজ পর্বতমালা কিংবা এশিয়ার উচ্চ পর্বতমালাগুলোতেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্দিজ অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে কৃষি ও সুপেয় পানির সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, আর আল্পসে পারমাফ্রোস্টের তাপমাত্রা বাড়ায় পাথুরে হিমবাহের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে।

সীমান্ত পেরিয়ে যৌথ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা :
নেপাল-চীন সীমান্তের এই ভূমিধস ও দুর্যোগ স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি কোনো রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে না। হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত নদী এবং হিমবাহগুলো বহু দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইএমএইচই-এর আরেক গবেষক লিউ চিয়াও উল্লেখ করেছেন, যখন কোনো বিপর্যয় নেপালে ঘটে এবং তার প্রভাব চীন বা অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশে গিয়ে পড়ে, তখন এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এর মোকাবিলা করা কঠিন।

উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলে এ ধরনের জলবায়ু-তাড়িত দুর্যোগ মোকাবিলায় তাই ক্রস-বর্ডার (আন্তঃসীমান্ত) তথ্য শেয়ারিং, যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সমন্বিত পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি যদি অবিলম্বে রোধ করা না যায় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে শক্তিশালী আগাম সতর্কবার্তা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে হিমালয়ের কোলঘেঁষা দেশগুলোতে এ ধরনের বিপর্যয় ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নেই মানবজাতির দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিহিত রয়েছে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

উপকূলের ১৪ জেলায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬: কতটা নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা?

পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস যৌথভাবে কাজ করবে

কোম্পানির হস্তক্ষেপ তামাক নিয়ন্ত্রণের বড় বাঁধা

realme C100 Set to Bring All-round Durable Champion 8000mAh Titan Battery

অলরাউন্ড ডিউরেবল চ্যাম্পিয়ন ৮,০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার টাইটান ব্যাটারি নিয়ে আসছে রিয়েলমি সি১০০

মানিকগঞ্জে বাসচাপায় তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি নিহত

আজ বিশ্ব বসতি দিবস

বৃষ্টির পর তেঁতুলিয়ায় শীতের আমেজ, তাপমাত্রা নামল ২০ ডিগ্রিতে

হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ৩ মৃত্যু

ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ২ হাজার ৮৯

সরকারি হাসপাতাল তদারকিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৫৪ কর্মকর্তা